বড়গল্প: অবিশ্বাস

পরিপাটি সংসার। দুজন দুজনাতেও চমৎকার। মনের বিভেদ শরীর দাবীতে ভোলে, শরীরের বিভেদ মনের দাবীতে ভোলে। অনুভূতি প্রখর, সংবেদনশিলতা বেশি, ভালোবাসাও বেশি, তবে অবিশ্বাস বেড়েছে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে।

অনুপমের কোনো রুটিন নেই। বড় একটা চাকরি করত, চাকরিতে কী একটা খটমট হওয়ায় চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে নিজে একটা এডফার্ম চালায় বর্তমানে। কাজ পেলে কিছু করে, না পেলে না করে, কোনো তাড়াহুড়া নেই। চলে যাচ্ছে একরকম। সংসারে বিশেষ কোনো বৈচিত্র নেই, তবে অনুপমের নিজের জীবন বৈচিত্রপূর্ণ, অবশ্য বৈচিত্রের প্রায় পুরেটা তার নিজের ভেতর থেকে আসে। সেগুলো শুধু লালনে করলেই হয়।

সৌদার বেলায় বিষয়টা ভিন্ন। সে নিষ্ঠাবান গৃহিণী। গৃহকর্ম তার নেশার মত, শিক্ষিত নারী তাই কর্মে ত্রুটিও কম। কাজ তার সব শেষ করা চাইই চাই, ব্যক্তির চাহিদার চেয়ে ঘরের দৈনন্দিন কাজ তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এদিকটা অনুপমের ভালো লাগে না, অনুপম মনে করে সৌদা খানিকটা বাতিকগ্রস্থ।

শুরু থেকেই ওদের সম্পর্কে চাপা অবিশ্বাস ছিল, এখন সেটি প্রকট হয়েছে। প্রথমদিকে অনুপম সৌদাকে অবিশ্বাস করত, এখন উল্টোটা বেশি হয়। অবিশ্বাস যাকে করা হয় তার চেয়ে অবিশ্বাস যে করে সে ঠকে বেশি। নিজের ভেতরটা অহেতুক খা খা করে। কিছু না হারিয়েও সব হারিয়েছি মনে হয়।

গত কয়েক মাস ধরে অবিশ্বাস চরমে পৌঁচেছে। অনুপম বাইরে গেলে সৌদার মনে হয় সে কারো সাথে রুম ডেটিংএ গেছে। অনুপমের মনে হয়, সৌদা বাসায় কাউকে ডেকে নিয়ে এসেছে। শুধু ভাবনার মধ্যে তারা আর সীমাবদ্ধ নেই, রীতিমত পাহারা দিতে চায় এখন। অনুপম মাঝে মাঝে অফিশ থেকে এসে দেখে যেতে চায় সৌদা কী করে, কিন্তু এভাবে আসাটা সমস্যা, অন্যরা কী মনে করবে! আবার কাউকে এ দায়িত্ব দিতেও পারছে না। মানুষ কী ভাববে?

দাম্পত্য জীবনে অনেকেরই এ ধরনের সমস্যা থাকে, চেপে যায় বেশিরভাগ লোকে, অনেকে রাষ্ট্র করে। অনুপম এবং সৌদা দুজনেই এ বিষয়ে খুব সচেতন। কাউকে বলে বেড়াতে চায় না কিছু ওরা। ভাঙচুর চলছে শুধু নিজেদের ভেতরে।

আজকে যেন মন মানছে না কারো। অনুপম ভাবছে, সৌদা নিশ্চয়ই রুমে কাউকে নিয়ে আসবে না হলে এত সিরিয়াসলি ফোন করে বাসায় কখন যাব জানতে চাইল কেন। আবার সৌদা ওদিক থেকে ভাবছে, নিশ্চয়ই আজকে অনুপমের কোনো প্লান আছে না হলে বাসায় কখন আসবে স্পষ্ট করে জানাতে পারল না কেন।

সৈৗদা দেরী করতে চায় না, তাড়াতাড়ি শাড়ীটা পরে নিয়ে বেরোয়। আজকে সে অনুপমকে হাতেনাতে ধরবে। ওদিকে অনুপমও বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে, সৌদা আজকে আর পার পাবে না কোনোভাবে।

কিছুদূর যেতে না যেতে রাস্তার মাঝেই দুজনের দেখা হয়ে যায়। রাগে ক্ষোভে দুঃখে কেউ কাউকে কিছু বলতে পারে না। দুজনেরই ভাবটা এমন- ধরা পড়ে গেছো আজকে! ‘কোথায় কে যাচ্ছ ‘ প্রশ্ন করার দরকার নেই। দুজনেই নিশ্চিত যে তারা চোর ধরতে পেরেছে। কেউ কিছু না বলে চলমান থাকে, একজন আরেকজনকে বুঝাতে চায় যে সে কোনো কাজে যাচ্ছে। পুরুষ পরাজিত হয়, অনুপম পিছু নেয় সৌদার। সৌদা হাঁটতে হাঁটতে কিছুদূরে একটি শপিং কমপ্লেক্সে যায়, এটা সেটা দেখতে থাকে।

অনুপম ভাবে, নিশ্চয়ই এখানে কেউ আসার কথা আছে। তক্কে তক্কে থাকে। কিছুক্ষণ পরে সৌদা টুকিটাকি কিছু জিনিস কিনে বের হয়। এবার আর বাধ মানে না অনুপমের। বলেই ফেলতে চায়, “কী, আমাকে দেখে নিশ্চয়ই ফিরে গেছে! বললেই পারতে .. “ নিজেকে সংযত রাখে, বলে না কিছু, ধরা দেয় না।

অফিশে ফিরে যায় আবার। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, সৌদার সাথে খাতির আর কিছু করবে না। যে যার মত থাকবে। সৌদাও এদিকে খুব শক্ত হয়ে যাবে ভাবছে আজ থেকে। যাহার নামে যাক অমন স্বামী তার। “নিশ্চয়ই বাসার পাশের দিপ্তী বৌদির কাছে যাচ্ছিল সে, না হলে এমন অসময়ে বাসার দিকে আসবে কেন? আমাকে তো বলেছিল আসবে না। কখন আসবে ঠিক নেই।” -চলবে


গল্পটি দিব্যেন্দু দ্বীপ -এর গল্প সংকলন থেকে সংগৃহীত

You may also like...