রাখাল, গরু ও ধনী লোকটি

ছোটোগল্পএক রাখাল একবার তার গরুগুলো নিয়ে পড়লো মহা মুশকিলে। দুএকটি গরু এদিক ওদিক পালাতে চায়, অবশ্য সেগুলোই বুদ্ধিমান গরু। কিন্তু বুদ্ধিমান গরু কে চায় এ জগতে? রাখাল সেগুলোকে ইচ্ছেমতো পিটুনি দিয়ে বশে রাখতে চেষ্টা করে। কিন্তু দিনে দিনে এ ধরনের বেয়াড়া গরুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ফলে রাখাল কিছুতেই আর গরুর পাল বাগে আনতে পারে না।
রাখাল খুবই চিন্তিত হয়। সে মানুষের বুদ্ধি নেওয়া শুরু করে। কিন্তু কোনো বুদ্ধি কাজে আসে না। অবশেষে সে খুঁজে পেলো ঐ এলাকার একজন মস্ত ধনী মানুষ। তাকে গিয়ে বলল, হুজুর, অাপনি যেহেতু একজন ধনী মানুষ, নিশ্চয়ই আপনার অনেক বুদ্ধি, তা আমাকে একটা সমস্যা থেকে উদ্ধার করুন না প্লিজ।
লোকটি প্রশংসা পেয়ে রাখালের প্রতি সদয় হয়। জানতে চায় রাখালের সমস্যা। সব শুনে সে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল, রাখাল, তুমি কিছু ভুল করে ফেলেছো, গরুগুলো একটু বুদ্ধিমান হয়ে উঠেছে বেশি, এখন পিটিয়ে আর হবে না, কারণ, তুমি শুরু থেকে অকারণে পিটাওনি। তোমাকে এখন প্রমাণ করতে হবে যে তুমি ওদের খুব ভালোবাসো।
রাখাল বলে, কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব। গায়ে হাত বুলাতে গেলেই তো ওগুলো গুতোতে আসছে তেড়ে।
নাহ্, ওভাবেও হবে না। তুমি একটা কাজ করো, একজন লোক নাও কিছুদিনের জন্য। মাঠে গিয়ে গরুগুলোর সামনে ঐ লোকটিকে ইচ্ছেমতো পিটাবে, এটা দেখে গরুগুলো ভাববে—তাহলে রাখাল তো খুব ভালো, কারণ, আমাদের তো এতটা নির্দয়ভাবে মারে না, যতটা মারছে ঐ মানুষটাকে। “মানুষের চেয়েও আমাদের বেশি ভালোবাসে রাখাল!”
রাখাল ঠিক তাই করে। কিন্তু কয়েকদিন না যেতেই বাধে বিপত্তি। লোকটি পালায়, কার সাধ্য আছে যে এত মার খাবে! রাখাল আবার ঐ ধনী লোকটির কাছে যায়। সবশুনে লোকটি বলে, তুমি তো খুব বোকা দেখছি, এত মার খেয়ে কেউ কি থাকবে? তাছাড়া তুমি নিয়েছো নিশ্চয়ই একটা বুদ্ধিসুদ্ধিআলা লোক। তুমি এমন একটি লোক নেবে, যে দেখতে শুনতে শুধু মানুষ, কিন্তু বুদ্ধি আসলে ঐ গরুগুলোর চেয়েও কম।
রাখাল সেরকম একজন লোক খুঁজে বের করে। কিন্তু সমস্যা সেই আগের মতোই। এই লোকটিও চলে যায়। রাখাল আবার ঐ ধনী ব্যক্তির কাছে যায়। এবার ধনী লোকটি চিন্তায় পড়ে যায়। “তাহলে কি রাখালের কাছে আমার নির্বোধ প্রমাণীত হতে হবে!”
লোকটি এবার ভাবে, নিজে কী করতাম সেই বুদ্ধি কেন আমি রাখালকে দিচ্ছি! যেটা করা উচিৎ সেটি কেন বলছি না, তাহলে তো আমি সহজেই বুদ্ধিমান প্রমাণীত হতে পারি।
ধনী লোকটি এবার রাখালকে বলে, রাখাল, তুমি কি তোমার গরুগুলোর ঠিকমতো যত্নআত্তি করো? ওগুলোকে ঠিকমতো খেতে দাও?
রাখাল বলে, হুজুর, তাতো ঠিকমতো খুব একটা দিতে পারি না। বোঝেন তো হুজুর, কিছু একস্ট্রা ইনকাম করতে গিয়ে ওদের খৈল ভুষিতে কিছু কম পড়ে যায়।
ধনী লোকটি বুঝতে পারে যে রাখাল সঠিক পথে নেই বলেই বুদ্ধি নিতে এসেছে। আসলে সঠিক পথে থাকলে কারও বুদ্ধি নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। তারপরও সে রাখালকে একটা পথ বাতলে দিতে মরিয়া। কারণ, সেও একই পথে ধনী হয়েছে—তাই সঠিক বেঠিক নিয়ে তার কোনো মাথা ব্যথা নেই, সে শুধু হুজুর থাকতে চায়।
লোকটি রাখালকে বলে, তাহলে তুমি একটা কাজ করো, এবার যে লোকটি তুমি নেবে তার সঙ্গে আগে চুক্তি করে নেবা, তাকে পিটুনি বাবদ তুমি কত টাকা বেশি দিবা এটা ঠিক করে নেবা। আর এই টাকাটা উসুল করবা গরুর খৈল ভুষি আরও একটু কমিয়ে দিয়ে।
রাখাল খুব খুশি হয়। একটা লোকের সাথে সে এই চুক্তিটা করে। এবার খুব কাজ হচ্ছে। লোকটিও আর যায় না, গরুগুলোও রাখালকে খুব ভালোবাসতে শুরু করেছে—গরুগুলো ভাবে, “রাখাল আমাদের কত না ভালোবাসে! লোকটিকে রোজ এত পিটায় … কিন্তু আমাদের তো অনেক কম পিটায়।”

You may also like...