ছোটগল্প: সিনভেঘের গান

কথা হচ্ছিল প্রাগৈতিহাসিক যুগের এক লেখকের সাথে, যাকে আপনারা মানেন, কিন্তু তাকে জানেন না। আমি গিয়েছিলাম মিগরার নামক দেশটিতে। প্রায় ৩৫০০ বছর আগে আমি সেখানে গিয়েছিলাম।
দেশটি এত ভালো লেগেছিল যে এরপর থেকে প্রায়ই যেতাম। সিনভেঘ নামে ঐ লেখকের বাড়িতে আড্ডা দিতাম। ওনাকে তখন ঐ অঞ্চলের সবাই গুরু মানত। তবে ওনার মনে একটা দুঃখ ছিল। উনি চাইছিলেন আমি যেন গোপনে ওনার সাথে কিছুদিন কাটাই। আমি এক মাস থাকতে রাজি হয়েছিলাম।
প্রতিদিনই উনি আমার সাথে কথা বলতেন। বললেন, “এখন আর আমার হাতে কিছু নেই, যে পথে আমি মানুষকে মানুষ করতে চেয়েছিলাম, সেটি বুমেরাং হয়েছে। আমি বুঝতে পারছি সবকিছু উলোট পালোট হতে যাচ্ছে।”
উনি আমাকে খুলে বলতে চাইলেন। বুঝাতে চাইলেন আমি যেন বার্তাটা পৃথিবীর মানুষের কাছে পৌঁছে দিই।
উনি বললেন–
“আমি বর্বর মানুষকে মানুষ করতে চেয়েছিলাম। যেহেতু আমাকে সবাই মানে, রাজা-প্রজা সবাই মানে, তাই আমি এমন কিছু বলতে চেয়েছিলাম যাতে মানুষ সভ্যতার দিকে অগ্রসর হতে পারে।
আমি তখন তোমায় বয়সেই ছিলাম। এখন থেকে ৫০ বছর আগে আমি মানুষকে এ ‘মন্ত্র’ দিয়েছিলাম। মানুষকে পাপ পূণ্যের কথা বলেছিলাম, স্বর্গ-নরকের কথা বলেছিলাম। তাতে প্রথম প্রথম ভালোই কাজ হয়েছিল। দলে দলে মানুষ আমার কাছে আসতে শুরু করল। আমাকে বানিয়ে বানিয়ে অনেক কথা বলতে হতো।
কাকে কী বলতাম সবসময় মনেও থাকত না। কিন্তু ওরা আমার বলা সব কথা মুখস্থ করে ফেলত। ওরা নিজেদের মধ্যে রক্তরক্তি বাধিয়ে দিত আমার বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে। দুই দলই আমার কাছে আসত প্রমাণ করতে। আমি দুটোই খারিজ করে দিয়ে আবার নতুন কথা বলতাম।
এরপর মানুষের মধ্যে বড় পরিবর্তন চলে অাসল। মানুষ খুব ভয় পেয়ে গেল। পাপের ভয়ে মানুষ খুব নির্জীব হয়ে যেতে থাকল। মানুষের মধ্য থেকে স্বাভাবিকতা হারিয়ে গেল।
সবকিছুকে তারা পাপ পূণ্য দিয়ে বিচার করতে শুরু করল, এবং একে অপরের সাথে বিতর্কে মেতে উঠতে থাকল। প্রতিদিন বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খুনের খবর আসতে থাকল।
অামার কথার ব্যত্যয় হলেই ওরা খুন করত। অথচ অামি তো নানান জনকে নানান কিছু বলেছি। আমিও তো আর মনে করতে পারব না কাকে কী বলেছি।
কিন্তু ওরা যার যার মুখস্থ করে রেখেছে অামার সব কথা। কোনো কোনো দল চটি বইও বের করেছে। দশ বছর একটা ঝঞ্জাময় সময় কেটেছে মিগরারে। তখন এখানে সবে কেবল একটা সমাজ কাঠামো দাঁড়াতে শুরু করেছে, কোনো সমাজপতি বা ওভাবে কোনো রাজাও ছিল না।
যে যার জোরে চলত। তখন আমিই হয়ে উঠলাম মূল ত্রাতা। দেশের অঘোষিত প্রধান আমি। দেশ বলতে যত দূর পর্যন্ত ওরা আমার বার্তা নিয়ে যেতে পারত ততদূর পর্যন্ত আমি প্রধান হয়ে উঠতাম।
আমি অনুভব করলাম, শুধু স্বর্গ-নরক তত্ত্ব দিয়ে মানুষকে পথে রাখা যাচ্ছে না। মানুষ হতাশ-অবসন্ন হয়ে যাচ্ছে, কোনোকিছু আর চলছে না। এরপর পাপ মোচনের কথা বললাম।
বললাম, পাপ থেকে নিষ্কৃতি লাভেরও উপায় আছে। তারপরেও সবকিছু এলোমেলো হয়ে যেতে থাকল। খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। মনে হল, মানুষকে বিধিবদ্ধ কেনো উপায় বাতলে দিতে হবে, যাতে তারা সুস্থির হতে পারে।
ভাবলাম, নিজের নামে আর নয়, সবকিছু অলৌকিক আখ্যা দিতে হবে। আমি কোথা থেকে কীভাবে কী জানছি তা মানুষকে জানাতে হবে। আমার একটা বিরোধীপক্ষও তলে তলে গড়ে উঠছিল। তারা চাইছিল আমি যেন এভাবে সরাসরি কোনো সমাধান না দিই।
তাদের বক্তব্য ছিল, “এভাবে সরাসরি মনগড়া সামধান দিলে মানুষের অগ্রগতি থমকে যাবে।” আমার বিরোধিতা করার জন্য একটি সংগঠন বেশ প্রকাশ্যে চলে এল।
কিন্তু তাদের কথা ধোপে টিকল না, গণজোয়ার তখন এমন পর্যায়ে যে এরকম একশোজন দার্শনিককে আমার বিরোধিতা করার জন্য হত্যা করা হল।
এ হত্যকাণ্ডে আমায় সায় ছিল না, কিন্তু জনগণকে থামতে বলার মতো সাহসও আমার ছিল না। আমি সবকিছু সামাল দিতে চাচ্ছিলাম। শেষ করতে চাচ্ছিলাম। সকল বক্তব্য এক জায়গায় এনে মানুষের জন্য একটা জীবনপ্রণালী তৈরি করে দিতে চাইছিলাম।
[অসমাপ্ত, বাকী অংশ এক সপ্তাহ পর]


দিব্যেন্দু দ্বীপ

You may also like...