যৌন নির্যাতনকারী সেই ভিসি অবশেষে ধরা খেলেন: নারী কর্মচারী ঝিলিক তার শিশু সন্তানকে বুকে জড়িয়ে আর্তনাদ করে ভিসি ভবনের সামনে সন্তানের স্বীকৃতি চান …

শিক্ষকদের মোবাইলে যখন তখন মেসেজ পাঠানো, বিভিন্ন জনকে প্রস্তাব দেওয়া -এসব তিনি বহুদিন ধরে করে আসছেন। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, বেশিরভাগই তরুণ শিক্ষক শিক্ষিকা সেখানে। শিক্ষিকারা কেউ তাকে জিম্মি করে সুযোগ সুবিধা বাগিয়ে নেয়, কেউ দূরে সরে, কেউ আবার কাছেও ভেড়ে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. খোন্দকার নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ সবসময়ই আছে, কিন্তু কীভাবে কীভাবে যেন তিনি সবকিছু ম্যানেজ করে ফেলেন।

বসিমুরপ্রবি

ভিসি বাংলোর সামনে নারীর চিৎকার: আমার সন্তানের বাবা এই ভিসি নাসির উদ্দিন। প্রফেসর ড. খোন্দকার নাসির উদ্দিন।

ভর্তি বাণিজ্য থেকে শুরু করে নিয়মবহির্ভূত নিয়োগ বাণিজ্য, ক্যাম্পাসে নিজের বাসভবনে বিউটি পার্লার দিয়ে জমজমাট ব্যবসা চালানের অভিযোগও রয়েছে ছাত্রদলের যুক্তরাজ্য শাখার সাবেক এই নেতার বিরুদ্ধে। তার এ স্বেচ্ছাচারিতায় কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।

৫ মার্চ ২০১৭ রোববার ‘ভিসির বাসভবনে বিউটি পার্লার!’ শীর্ষক শিরোনামে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে থেকে জানা গিয়েছিল অনেক কিছু, কিন্তু ঐ পর্যন্তই, কিছুই হয়নি তার। তবে এবার বোধহয় আর পারলেন না। 

গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে অবশেষে মুখ খুললেন আফরিদা খাতুন ঝিলিক (১৯) নামে এক নারী কর্মচারী।

এমএলএসএস হিসেবে মাস্টার রোলভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত নারী কর্মচারী ঝিলিক তার শিশু সন্তানকে বুকে জড়িয়ে আর্তনাদ করে ভিসি ভবনের সামনে সন্তানের স্বীকৃতি চান।

নিজের সন্তানের বাবা ভিসি দাবি করে গেলো রোববার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ভিসির অফিস কক্ষের সামনে শিশু সন্তানকে বুকে জড়িয়ে চিৎকার করে প্রতিবাদ জানান ঝিলিক। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টাররোলে এমএলএসএস হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত।

গেলো ২২ এপ্রিল ২১ মিনিটের ভিডিও ক্লিপ ও ২৩ এপ্রিল সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ঝিলিক তার এক বছর বয়সী কন্যাসন্তানের পিতৃত্বের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দ্বারস্থ হন। এসময় সে ভিসিকে তার সন্তানের বাবা দাবি করে চিৎকার করে বলতে থাকেন ‘এ সন্তান ওনার, এ সন্তানের সঙ্গে ওনার চেহারার অনেক মিল আছে। এসময় ভিসি খোন্দকার নাসির উদ্দীন তার লোকজন দিয়ে ঝিলিককে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের তৃতীয় তলার একটি কক্ষে দীর্ঘসময় আটকে রাখেন। এদিকে ভিসির নারী কেলেঙ্কারির বিষয়টি এখন টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে।

এদিকে, ভিসির কুকীর্তি ধামাচাপা দিতে উঠে পড়ে লেগেছে একটি প্রভাবশালী মহল। কথিত সাংবাদিকদের হাত করে গণমাধ্যমকে ম্যানেজ করার চেষ্টা চলছে বলেও জানা গেছে। মুখ না খুলতে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে ভুক্তভোগী ঝিলিককে।

আফরিদা খাতুন ঝিলিকের আর্তনাদের ধারণকৃত ভিডিও ক্লিপে আরও দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. খোন্দকার নাসির উদ্দিন চাকরি দেয়ার কথা বলে তাকে বিভিন্ন সময় যৌন নির্যাতন করতে বাধ্য করেন। এছাড়া সহায় সম্পত্তি করে দেয়ার আশ্বাস প্রদান ও ভালোবাসার ছলনায় প্রলুব্ধ করে দিনের পর দিন তার বাংলোয় রেখে তাকে ব্যবহার করেন।

নির্যাতিত ঝিলিক বলেন, আজ আমি সবকিছু ফাঁস করে দেব। খুলে দেব মানুষ নামের নরপশুর মুখোশ। এছাড়া ভিসিকে তার কন্যা সন্তানের বাবা হিসেবে দাবি করেন। এসময় তিনি দাবি করেন, আমার কাছে এমন সব ভিডিও ক্লিপ আছে যা আমার দাবিকে প্রমাণ করবে।

‘তুমিও এতিম আমিও এতিম, তুমি আমার কষ্ট বুঝবে-আমি তোমার কষ্ট বুঝব’ এমন সব আবেগী বক্তব্য দিয়ে ঝিলিককে ব্ল্যাকমেইল করেন ভিসি।

জানা গেছে, গোপালগঞ্জের পূর্বের জেলা প্রশাসক (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পরিচালক হিসেবে কর্মরত) মো. খলিলুর রহমান ২০১৬ সালে শেখ রাসেল দুঃস্থ পুনর্বাসন ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র, টুঙ্গিপাড়ায় অনাথ হিসেবে আশ্রিত ঝিলিককে পিতৃস্নেহে নিজের মেয়ে পরিচয়ে বড় করে তোলেন। পরবর্তীতে তিনি ঝিলিককে বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কাছে চাকরির ব্যাপারে অনুরোধ করেন। ভিসি খোন্দকার নাসির উদ্দীন তাকে নিজ বাংলোতে আশ্রয় প্রদানসহ মাস্টাররোলে চাকরি দেন।

পরে বিভিন্ন প্রলোভন দিয়ে ঝিলিককে ভোগ করে ভিসি নাসির। একপর্যায় সে গর্ভবতী হয়ে পড়ে। তখন গর্ভের সন্তান নষ্ট করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন ভিসি। কিন্তু সন্তান নষ্ট করতে অস্বীকার করেন ঝিলিক। ফলে ঝিলিককে চোর অপবাদ দিয়ে বাংলো থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ঝিলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্বে অবস্থিত সোনাকুড় গ্রামে বাসা ভাড়া নিলে ভিসি তার ক্যাডার বাহিনী দিয়ে ঝিলিককে মারপিট করায় এবং তাকে ওই এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলে।

পরবর্তীতে একটি সমঝোতার মাধ্যমে ঝিলিককে প্রতি মাসে আট হাজার টাকা প্রদানের অঙ্গীকার করেন ভিসি নাসির। ঝিলিকের ব্যবহৃত গ্রামীণ ফোন নম্বরে বিকাশ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ওই টাকা পাঠিয়ে দেয়া হতো। সর্বশেষ গেলো ২৪ মার্চ বিকাশের মাধ্যমে ঝিলিককে আট হাজার টাকা পাঠানো হয়। ভিসির আস্থাভাজন ও প্রভাবশালী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রশাসনিক একজন কর্মকর্তা এ দায়িত্ব পালন করতেন। দীর্ঘদিন ধরে কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকার পরেও প্রতি মাসে ঝিলিককে ওই টাকা পাঠানো হতো।

সবকিছু হারিয়েও অবশেষে চাকরি নামের সোনার হরিণটাও জোটেনি তার কপালে। চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তাকে বের করে দেয়া হয়।

অবশেষে লোকলজ্জা ও সমাজের রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে ভণ্ড ও প্রতারক ভিসির মুখোশ উম্মোচন করে দেন ভুক্তভোগী ঝিলিক। প্রয়োজনে গণমাধ্যমের দারস্থ হবেন বলেও জানান তিনি। জীবনযুদ্ধে পরাজয় মানতে নারাজ সে। সুযোগ পেলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে ভিসি নাসিরের বিরুদ্ধে নালিশ জানাবেন এবং প্রতারণার বিচার চাইবেন বলেও জানান ঝিলিক।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নাসির উদ্দিনের নারী কেলেঙ্কারীর বিষয়টি নতুন কিছু নয়। গত বছর পাঁচ মার্চ একটি শীর্ষ জাতীয় দৈনিকে ভিসির বাসভবনে বিউটি পার্লার শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। ওই সময় সংবাদটি দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নারী অফিস সহকারীর সঙ্গে ভিসির অনৈতিক সম্পর্কের খবর প্রকাশ হয়। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন নারী শিক্ষকের সঙ্গে ভিসির অনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও জনশ্রুতি রয়েছে।

এ বিষয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির সঙ্গে মুঠোফোন নম্বরে কয়েকবার কল করা হলেও তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে তার ওই নম্বরে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি তাতেও কোন সাড়া না দিয়ে ফোনটি বন্ধ করে দেন।

অসহায় অনাথ ঝিলিক ভিসির ক্যাডার বাহিনীর ভয়ে জিম্মি ও দিশেহারা। বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলা শহরে বিষয়টি এখন ব্যাপক আলোচিত। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।


খবরের সূত্র: বিভিন্ন অনলাইন এবং প্রিন্টেড পত্রিকা।

You may also like...