বিসিএস প্রিলিমিনারি শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি

বিসিএস পরীক্ষা এখন আর পূর্বের মত নয়, প্রিলিমিনারির পরীক্ষার সিলেবাস পরিবর্তন হয়েছে সেটি যেমন একটি দিক পাশাপাশি পরীক্ষার প্রশ্ন পদ্ধতিতেও ব্যাপক সংস্কার এসেছে।

নতুন সিলেবাসে অনুষ্ঠিত তিনটি (৩৫, ৩৬, ৩৭তম) পরীক্ষার প্রশ্ন বিশ্লেষণ করেন দেখবেন সেখানে গতানুগতিক প্রশ্ন খুব বেশি নেই, মেধাভিত্তিক প্রশ্নের পরিমাণ বেড়েছে, একইসাথে প্রশ্নের বৈচিত্রও বেড়েছে।

অর্থাৎ উপরিউক্ত দুটি বিষয় খুব গুরুত্বের সাথে মাথায় রেখে বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রস্তুুতি নিতে হবে। প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় লিখিত সিলেবাসটি মাথায় রাখলে ভালো হয়, তাতে বিসিএস পরীক্ষা সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা তৈরি হবে।

তাছাড়া যেকোনো বিসিএস-এ প্রিলিমিনারি এবং লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া মানেই এখন একটি চাকরির নিশ্চয়তা, একথা বলা যায়, কারণ, ৩৫তম বিসিএসে লিখিত এবং ভাইভায় উত্তীর্ণ সবাইকেই চাকরি দেওয়া হয়েছে , বিভিন্ন নন-ক্যাডার জব তাঁরা পেয়েছে, তাই বিসিএস পরীক্ষাটিকে গুরুত্বের সাথে নেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, প্রস্তুতি তাহলে কীভাবে নেবেন? বস্তুত পড়ালেখা এতদিন যা করেছেন তার সবই বিসিএস পরীক্ষায় কোনো না কোনোভাবে কাজে লাগবে। এখন আপনার যদি বিস্তৃত পড়াশুনা না থাকে তাহলে প্রচুর পড়তে হবে, আর আপনার যদি বিস্তৃত পড়াশুনা থাকেও তাহলে আপনাকে সিলেবাসটি মাথায় রেখে চর্চা করতে হবে।

যদি প্রশ্ন করা হয়, আপনি জীবনে ক্লাসের সিলেবাস বাদে কয়টি বই পড়েছেন? কী উত্তর দেবেন? কতটি বই পড়েছেন? ৫টি, ১০টি, ২০টি, ৩০টি? আমাদের ধারণা সংখ্যাটি গড়ে ৫টির বেশি নয়। আমাদের পড়াশুনার ভয়ঙ্কর একটি দিক এটি। আমরা পড়াশুনা দিয়ে অনেক কিছু আশা করি, কিন্তু আমাদের পড়াশুনা কোনো পর্যায়ে রয়েছে সেটি অনেক ক্ষেত্রেই বিচার্য হয় না।

ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অনার্স-মাস্টার্স পর্যন্ত যদি ধরি, তাহলে এই ১২ থেকে ১৪ বছরে কমপক্ষে পঞ্চাশটি বই পড়া থাকার কথা, যে খুব কম পড়ে তার জন্যেও, কিন্তু বাস্তবতা খুবই অন্যরকম।

তাই বলে একথা বলার সুযোগ নেই যে এখনই আপনারা শ খানেক বই পড়ে ফেলবেন, সেটি সম্ভব নয়, দরকারও নেই। বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতিও অনেকে দুই থেকে তিন বছর যাবত নেয়, কারো কারো ক্ষেত্রে সময়টা আরো বেশি। তাই এই সময়েও তালিকা করে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বই আপনাকে পড়ে ফেলতে হবে, শুধু গাইড বই নির্ভর হলে হবে না।

সবসময় মাথায় রাখতে হবে সিলেবাসটি, কারণ, বিগত পনেরো বছরের পড়াশুনার ঘাটতি দুই তিন বছরে কাটিয়ে ওঠা যাবে না। এজন্য সিলেবাসটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে পড়তে পারলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকবে।

ঘাবড়ানোর কিছু নেই, কারণ, কারোরই বিস্তৃত পড়াশুনা নেই, মাত্র দুএকজন বাদে। তাই গড়পড়তার মধ্য থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে আপনাকে আলাদা হয়ে উঠতে হবে। কঠোর পরিশ্রম এবং অনুশীলনের বিকল্প নেই এক্ষেত্রে।

অনেকে অনেক পড়েও ভালো করতে পারে না। পরামর্শ হচ্ছে, অনেক পড়া যেমন জরুরী, একইসাথে পরিকল্পিত পড়াশুনা আরো বেশি জরুরী। হাতড়িয়ে বেড়ালে হবে না। আউটলাইন করে পড়তে হবে, আপনি কী পড়বেন সেটি যেমন জানতে হবে, কী পড়বেন না সেটিও জানতে হবে।

প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় দুশোটি প্রশ্ন থাকে, দুশো প্রশ্ন আপনাকে পারা লাগবে না, তাই বিগত বছরের প্রশ্ন দেখে এটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে দুনিয়ার সব আপনাকে পড়ে ফেলতে হবে।

পরীক্ষায় অর্ধেক প্রশ্ন থাকে কমন প্রশ্ন, প্রথমত এই অর্ধেক প্রশ্ন আপনাকে পারতে হবে। আপনি যদি ভুলভাল না দাগান তাহলে মাইনাস মার্কিং-এর ফাঁদে পড়বেন না, এবং দুইশো নম্বরের মধ্যে একশো পেলেই আপনি প্রিলিতে উতরে যাবেন। বিগত তিনটি পরীক্ষায় (নতুন সিলেবাসে) কাটিং মার্কস এর চেয়েও কম ছিল।

পরীক্ষার আগে কমন জিনিসগুলোই ভালো করে চর্চা করুন। কোনোভাবেই এই মার্কসগুলো হাতছাড়া করা যাবে না। পরীক্ষার আগে একটি ভালো মানের মডলে টস্টে বই থেকে র্চচা করুন। ‘মডেল টেস্ট’ কেন, কীভাবে এটি কাজে লাগে–সেটি আপনাকে জানতে হবে।

মডেল টেস্ট হচ্ছে, পরীক্ষার অনুরূপ প্রশ্ন, অর্থাৎ ডামি প্রশ্ন, নিজেকে যাচাই করে নেওয়ার জন্য। তবে প্রশ্নগুলো যদি শুধু যাচাইমূলক না হয়ে পরীক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে এখান থেকেও কিছু প্রশ্ন বা অনুরূপ প্রশ্ন কমন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

বেশিরভাগ মডেল টেস্টের বইয়ে যে সমস্যাটি হয়–সেগুলোতে প্রচুর ভুল এবং রিপিটেশন থাকে। ফলে চর্চা করেও খুব বেশি লাভ হয় না।

দুশো মার্কসের প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়ে সেটি আবার বোঝার জন্য, বিশ্লেষণ করার জন্য সময়ের দরকার, প্রতিটি মডেল টেস্টের পিছনে আপনার দুই দিন করে যাবে, তাই পরীক্ষার দেড়মাস বা দুইমাস আগে থেকে যদি আপনি চর্চা করা শুরু করেন তাহলেও আপনি বিশ থেকে ত্রিশটার বেশি মডেল টেস্ট দিতে পারবেন না।

এটিই যথেষ্ট, কারণ, শুধু নিজেকে যাচাই করে তো লাভ নেই, আপনাকে শিখতে হবে। প্রতিবার পরীক্ষা দিয়ে দুশোর মধ্যে ৬০ পেয়ে লাভ কী? এর চেয়ে যে প্রশ্নে পরীক্ষাটি দিচ্ছেন সেটি বুঝে নেওয়া বেশি জরুরী।

মডেল টেস্টের এমন বইটি পড়ুন যেটি একগাদা আনকমন জিনিস দিয়ে ভরে রাখেনি। এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে পরীক্ষার্থীদের কমন জিনিসগুলো জানা হয়ে যায়। খুব আনকমন প্রশ্ন দিয়ে মডেল টেস্টের বই করতে নেই, সে ধরনের প্রশ্ন পরীক্ষার আগে শুধু শুধু আপনাকে হতাশ করবে, আপনার আত্মবিশ্বাস কমে যাবে।

এ ধরনের বই এড়িয়ে যান। মডলে টেস্ট বই থেকে গড়পড়তা প্রশ্নগুলো চর্চা করলে এবং বিশ্লেষণ করে পড়লে কাজে লাগে, পরীক্ষার আগে আত্মবশ্বিাসও বাড়ে, কারণ, এ ধরনের প্রশ্ন পরীক্ষায় থাকবেই।

একটি ভালো মানের মডেল টেস্ট বইয়ের মাধ্যমে আপনি নিজেকে যাচাই করতে যেমন পারছেন, একই সাথে কমন প্রশ্নগুলোও চর্চা করতে পারছেন। যেহেতু প্রশ্নগুলো করা হয়েছে সিলেবাসটি মাথায় রেখে, তাই সিলেবাসের কোনো কিছু আপনি পড়তে ভুল করেছেন কিনা সেটিও আপনি বুঝতে পারবেন।

মডেল টেস্টগুলো একই মানের হলে পরীক্ষা দিয়ে আপনি আপনার প্রগ্রেসও বুঝতে পারবেন। প্রতিটি মডেল পরীক্ষা এবং বিশ্লেষণের পরে আপনার উচিৎ একদিন পড়াশুনা করে আরেকটি পরীক্ষা দেওয়া। তাহলে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কিছু আপনার না পড়া থাকলে পড়ে ফেলতে পারবেন।

শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতরি ক্ষেত্রে একটি বিষয় মাথায় রাখা খুব দরকার−আপনি কী পড়েছেন এবং কী পড়েননি, সে সর্ম্পকে পরিষ্কার ধারণা রাখবনে। যা পড়েননি, খুব গুরুত্বর্পূণ না হলে শেষ মুর্হূতে পড়ার দরকার নেই। অনেকে অনেক কিছু বলে, তাই সবার সব কথা শুনে বিভ্রান্ত হবেন না।

পড়ার এরিয়া বাড়ানো ভালো, তবে যেটুকু পড়েছেন সেটুকু ভালোভাবে পড়াটা বেশি জরুরী। বিষয়টা অনেকটা হারানো জিনিস খোঁজার মত, বারে বারে খুঁজছেন, কিন্তু কোনো জায়গায় ভালো করে খুঁজছেন না, ফলে পাচ্ছেন না, কিন্তু জিনিসটি আপনার আশেপাশেই আছে। এক্সজসটিভলি খুঁজলে সুবিধা হয়–জিনিসটি আদৌ এখানে আছে কিনা নিশ্চিত হওয়া যায়। র্অথাৎ যা পড়তে হবে নিঃশেষ করে পড়তে হবে।

ধরুণ, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে, তাহলে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে এমনভাবে পড়তে হবে যে এখান থেকে প্রশ্ন আসলে আপনি পারবেনই। দুনিয়ার সব লেখক সম্পর্কে পড়লেন, কিন্তু ভালোভাবে পড়লেন না, এর চেয়ে যার সম্পর্কে পড়বেন এমনভাবে পড়বেন যে যেভাবেই প্রশ্ন করা হোক আপনি পারবেন।

রবীন্দ্রনাথের লেখা থেকে একটি প্রশ্ন প্রতিবার পরীক্ষায় আসেই, ২০০-এর মধ্যে একটি কনফার্ম প্রশ্নও অনেক কথা। পড়ে ফেলুন রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে, লাভ হবে দুই দিক থেকে, আসলে তিন দিক থেকে, এই পড়াটা আপনার ভাইভাতেও কাজে লাগবে। কথাটা হচ্ছে, কিছু জিনিস গভীরভাবে পড়তে হবে।

আসলে ভাসাভাসাভাবে পড়ার কিছু নেই। ওভাবে পড়বেন চলতি পথে কুড়িয়ে পাওয়া বই থেকে, সময় কাটাতে, ভাগ্য ভালো থাকলে সেখান থেকেও দুএকটি প্রশ্ন পেয়ে যেতে পারেন।

আরেকটি বিষয়, তথ্যের জন্য বাংলা পত্রিকা না পড়ে, ইংরেজি পত্রিকা পড়ুন, তাহলে দুটি কাজ হবে একসাথে, তথ্য জানা হবে, ইংরেজিটাও উন্নত হবে।

অনলাইন থেকে ইংরেজিতে কারেন্ট বিষয়গুলো জানা যায়, অনেক সাইট আছে এরকম, এগুলোর উপর চোখ রাখতে পারেন। বাজারের মাসিক পত্রিকাগুলো পড়বেন, তবে এগুলো খুব মূল্যবান নয় আসলে। এর চেয়ে ভালো হত প্রতি তিন মাস অন্তর সংগ্রহ করার মত এ জাতীয় ভালো কোনো পত্রিকা যদি বাজারে থাকত!

দাঁড়াচ্ছে, শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি ভালোভাবে নিতে হলে আগের প্রস্তুতি ভালো হতে হবে। বিসিএস-এর জন্য এক বছরে একটি ভালো প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব। যার অনেক পড়াশুনা আছে এবং ইংরেজি ও গণিতে এমনিতেই ভালো তাঁর জন্য সময়টা ছয় মাস হলেও চলে, তবে গড়পড়তা সবার জন্য এক বছরের একটি প্রস্তুতি লাগবে।

তাই পরীক্ষার আগ মুহূর্তে পড়াশুনা আপনি সাজেশন, মডেল টেস্ট নির্ভর করতে পারেন, কারণ, এ ছাড়া এখন কোনো উপায় নেই, তবে মূল পড়াশানা আপনাকে দীর্ঘমেয়াদেই করতে হবে।


ক্লোজআপনিউজ এডুকেশন ডেস্ক

You may also like...