শাঁখারিকাঠি গণহত্যা ।। বাগেরহাট


বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলার বাধাল ইউনিয়নের সর্ব দক্ষিণের একটি গ্রাম শাঁখারিকাঠি। গ্রামটি কচুয়া উপজেলা এবং মোরেলগঞ্জ উপজেলার মধ্যে সীমানা নির্ধারণকারী। শাঁখারিকাঠি (আলোকদি এবং শাঁখারিকাঠি গ্রামের সীমানায়) তখন একটি হাট বসত। ১৯৭১ সালে সেখানে সংগঠিত গণহত্যাটি শাঁখারিকাঠি নামে পরিচিতি পেলেও এটি আসলে ঘটেছিল অালোকদি গ্রামে। যেহেত ‘আলোকদি’ নামে আরেকটি গণহত্যা রয়েছে (ফরিদপুরে), তাই ‘শাঁখারিকাঠি’ নামটি সঠিকই হয়েছে, কারণ, স্থানটি পড়েছে আসলে তিন গ্রাম—অালোকদি, শাঁখারিকাঠি এবং সাগরকাঠির মধ্যবর্ত ী স্থানে।

শুক্র এবং সোমবার স্থানটিতে হাট বসত। সাধারণত পাশ্ববর্তী দুই তিন গ্রামের লোক ওখানে কেনাবেঁচা করতো। সেদিনও বাজার করতে গিয়েছিল কিছু নিরীহ মানুষ, তাঁরা ছিলো একেবারেই গ্রামের ক্ষুদ্র কৃষক শ্রেণির মানুষ অথবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, একেবারে ফড়িয়া ধরনের।

কাছের হাট হওয়ায় এমনও হতো বাড়িতে মা, কারো স্ত্রী হয়তো ভাত চড়িয়ে দিয়ে অপেক্ষা করছে তাঁদের ছেলে বা স্বামী হাট থেকে মাছ তরকারী নিয়ে আসলে রান্না করবে। সেদিনও সেরকমটি হয়েছিল অনেক বাড়িতে। ভুক্তভোগীদের বক্তব্য থেকে এরকম আরো অনেক হৃদয় বিদারক বিষয় জানা যায়।

এরকম হয়েছে যে একজন বাধোখালি (বাগেরহাট সদর উপজেলার একটি গ্রাম) থেকে পালিয়ে গিয়েছেন শশুরবাড়ি মোড়েলগঞ্জ উপজেলার বলভদ্রপুর গ্রামে, সেখানেও সমস্যা দেখে (বলভদ্রপুর গ্রামের কৃষ্ণ চক্রবর্তীর বাড়িতেও একটি গণহত্যা সংগঠিত হয়েছিল) পালিয়ে গিয়েছেন মামা বাড়ি অালোকদি গ্রামে। সেখান থেকে তিনি হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এই ব্যক্তির নাম কৃষ্ণ লাল হালদার। ঘটনার মাত্র মাস তিনেক আগে বিবাহ করে এভাবে তাকে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিল। তারপরেও শেষ রক্ষা হয়নি!

১৯৭১ সালের ৫ নভেম্বর, শুক্রবার ১৮ কার্তিক ১৩৭৮ বঙ্গাব্দ রাজাকার বাহিনী উপরিউক্ত স্থানটিতে গণহত্যা সংগঠিত করে। ৪২জন ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষকে সেদিন হাতে হাত বেঁধে গুলি করে হত্যা করা হয়।

হত্যার পর এমনকি লাসগুলোও পাহারায় রেখেছিল রাজাকারেরা। পরের দিন লাসগুলো ঢিপ দিয়ে নৌকায় তুলে নিয়ে যায় রামচন্দ্রপুর গ্রামের খালের পাড়ে। ওখানে কোনোমতে লাসগুলো মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়। অনেক লাসের হাত পা মাথা বেরিয়ে ছিল, যেগুলো পরে শিয়াল শকুনে খেয়েছে।

ঘটনাস্থলে একটি স্মৃতির মিনার নির্মিত হয়েছে, কিন্তু সেটি অসম্পূর্ণ এবং ভুলবাক্য সম্বলিত। যে স্থানে বর্ব র এ হত্যাকাণ্ডটি সংগঠিত হয়েছিল সে জায়গাটিও এখন পরিবর্তন হয়েছে—সম্প্রতি সেখানে একটি ছাপড়া মসজিদ নির্মিত হয়েছে, স্থায়ী কিছু দোকানপাট উঠেছে, তবে হাটটি এখন আর বসে না।


You may also like...