বই থেকে সংকলন: নারী ১৯৭১, নির্যাতিত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার

বই থেকে সংকলন
নারী ১৯৭১: নির্যাতিত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার
প্রথমা প্রকাশন।

শঙ্করী চক্রবর্তী
পিতা: শিশির কুমার রায়, গ্রাম: ডাকরা, ইউনিয়ন: পেরিখালী, থানা: রামপাল, জেলা: বাগেরহাট (১৯৭১ সালে খুলনা জেলার অন্তর্গত মহকুমা)। শিক্ষাগত যোগ্যতা: পঞ্চম শ্রেণি, ১৯৭১ সালে বয়স: ২৩, পেশা: গৃহিণী। সাক্ষাৎকার গ্রহণকালে পেশা: গৃহিণী।

১৯৭১ সালের কথা আপনার মনে আছে কি?
♦ আছে। দেশে হে সময় যুদ্ধ লাগিছিল। তহন আমি শ্বশুরবাড়িতে থাকতাম। আমার স্বামী এই গ্রামের নামকরা একজন মানুষ ছিল। খুব সাহসী এবং শক্তিশালী ছিল। একদিন শোনা গেল হিন্দুদের বাড়ি লুঠ হবে। তার জন্য আমার স্বামী কয়েকজনরে নিয়া গ্রাম পাহারা দিতি লাগল। অনেকগুলো মানুষ পাহারা দিত। এক মাস পর্যন্ত পাহারা দিয়া রাখছে। পরে আর ঠেকাতে পারিনি। হঠাৎ চারি ধারদে অনেক লোক আইসে লুটপাট আরম্ভ করি দিল। আমাদের বাড়িতে তিন-চারডে গোলায় ধান-চাউল ছিল। খাট-পালং, থালাবাসন ছিল অনেক। পরিপূর্ণ সংসার আমাদের। গোয়াল ভরা গরু, অন্তত ৩০-৩৫টা গরু, দুইটা পুকুর। একসঙ্গে আমরা ৩৫-৩৬ জন লোক সংসারে। সবকিছু লুট করি নিয়ে গেল।

এটা কোন দিন ঘটল, তারিখ মনে আছে আপনার?
♦ সেই তারিখটা স্মরণ নাই আমার। আমরা মাত্র রান্নাবান্না করি দুপুরবেলা ভাত খাইছি। এমন সময় লুটপাট আরম্ভ হইছে। আমরা বাড়ি থাকতেই লুট করা আরম্ভ হইছে।

যারা আপনাদের বাড়িতে লুটপাট করতে এসেছিল, তাদের কাউকে আপনি চিনেছিলেন?
♦ আমরা তো তহন বউ মানুষ। আমরা বাড়ি থাইকা কোনো দিন বাইর হইতাম না। আমরা তাদের চেনব কী করে! মেয়েছেলেও কিছু লুটপাট করিছে। এখানকার মুসলমান পাড়ার মেয়েরা। তারা আনন্দ-সহকারে আমাদের যার যা পাচ্ছে তা-ই নিয়া যাচ্ছে। থালা, কাঁসা, গরু-বাছুর—যা সামনে পাইছে।
আমরা ছিলাম বাড়িতেই। লুটপাট সব হয়ে গেল। পরে আমরা চলি যাচ্ছিলাম। একদম চলিই যাইতাম। তহন আমাগো ওই সামনে থাইকা ফিরায়া নিয়ে আসলো। ওই বাঁশতলের মুসলমানেরা। তাদের আমি চিনি না। তহন তো বহু মানুষ। তাদের কারো হাতে লাঠি, দা। হেরা আমাদের ফিরায় নিছে। জোর করে ফিরাই নিয়া আইসে বলছে, তোমাদের যা কিছু লুট হইছে ফেরৎ আইনা দেওয়া হবে। তোমরা আর যাইও না।
আমাদের তো সবকিছু নিয়া গেছে। বাড়িটা শুধু এই আগুন দিয়া পোড়ায়নি। আর সবই নিয়া গেছে। তাদের জোরাজুরিতে আমরা ফিরে আসলাম বাড়ি। তারা আমাদের চাইল-ডাইল কিছু দিছিল। চাইরডা চাইলে কয়দিন খাওয়া যায়! আমাদের আর কিছু তো নাই। দুই-তিন দিন থাকার পর আমরা ঠাকুর বাড়ি চইলা গেলাম। তারপর দিনকা দেখতাছি ঠাকুরবাড়ির চারদিকে লোক আর লোক। মনে হচ্ছে যেন একটা মেলা। মেলায় যেরকম অবস্থা হয়। গরমের দিন। কারও পরনে একটা গামছা, কারও পরনে ধুতি। ঠাকুরবাড়ির ওখানে বিরাট জায়গা। কেউ রান্নাবান্না করতিছে। কারও রান্নাবান্না শেষ হইছে। আমরা যেমন আইছি, তারাও তেমন বিভিন্ন জাগাত থাকি আইছে।

তারা ওখানে এসেছিল কী জন্য?
♦ ওখান থাকি সব একসঙ্গে ভারত চলি যাবে বলে। ওই সময় তো আমাদের সবারই একই অবস্থা। সবার বাড়িতে লুটপাট হইছে। তাই সবাই চলি যাচ্ছে।

কত লোক এসেছিল ওখানে?
♦ অনেক লোক। ৩০-৩৫ খান বিরাট বিরাট পানসি নৌকা ঘাটে, কিছু জিনিসপত্র। বিভিন্ন গ্রামের লোক ওখানে আইছে। দুপুরে খাইয়া নৌকায় উঠে যাবে। এমন সময় ওখানে গুলি আরম্ভ হইল। দুপুরবেলা। সেদিন ছিল বোধ হয় বাংলা ৬ জ্যৈষ্ঠ।
আমি তখন বাজারের কাছে। কোলে আমার মেয়ে। সবায় বলতিছে, মারি ফালায় দিল, মারি ফালায় দিল। শিগগির দৌড়াও। মেয়ে আমার কোলে। ঐ মেয়েরে নিয়ে আমি দৌড় দিলাম। খুব গুলি হচ্ছে। মনে হচ্ছে পাখির ঝাঁকে লোকে যেমন গুলি করে পাখি মারে, তেমনি করে মানুষ মারতিছে। কয়ডা পাখি উড়তে পারে, আর কয়ডা পাখি মরতি পারেĮ এইভাবে গুলি করতিছে।
আমি দৌড়ে ঠাকুরবাড়ির কাছে বিলের ভিতরে নামিছি। দারাম-দুরুম গুলি হচ্ছে আর পড়ে যাচ্ছে সব। চোখের সামনে দেখতেছি সব পড়ে যাচ্ছে। মরা মানুষরে ছোরা দিয়ে কেউ কেউ কাইটতাছে। যারা ছোরা দিয়ে মানুষ কাইটাতাছে তাদের একেকজনের হাত কেনু [কনুই] পর্যন্ত রক্ত মাখানো। ছোরা থাকি টপটপায়ে রক্ত পইড়তেছে।
আমার সঙ্গে আমার শাশুড়ি আছে। আর আমার সেই বাচ্চাডা আমার কোলে। আমরা জলের ভিতরে। এই সময় আমার বাড়ির লোক কেউ আমার কাছে নাই। শুধু আমার শাশুড়ি আর আমি। সুন্দরপুরের দুইটা-তিনটা মেয়েছেলে আর আমার বাড়ির পাশের দুইটে মেয়েছেলে আছে। আমার শশুর আছে। উনি আছে আমার থাইকে একটু দূরে। আমি দেখতেছি কি, চারদিকে আগুন। একসময় দেখি তিন-চারজন দৌড়াচ্ছে একটা লোকের পিছনে। তারে ওরা দাবড়াইয়া পুকুরের মধ্যে নিয়া গেল।
তারে আমি চিনতাম। নাম ছিল পরিমল। ওরে দাবড়াচ্ছে। ওই জলের ভিতর থাইকা দেখতেছি। এদিকে আমার শাশুড়ি কাদা উঠায়ে আমার সমস্ত গায় লেপে দিচ্ছে আর বলছে, মা, তোমারে ওরা ধরে নিয়ে যাবে। তোমারে ওরা থুয়ে যাবে না, মা। আমার ছোট মেয়েডার তখন কথা ফোটেনি। কেবল মা, বাবা ডাক ফুটিছে। মেয়েটা কেবল কচ্ছে মা, মা। আর শাশুড়ি আমার সব চোখমুখ ঢাইকা দিছে কাদা দিয়ে। আমি কচ্ছি, মা, তুমি আমারে দেখতি দাও। যদি আমারে ধরে নিয়ে যায়, যাক না, দেখব কে আমারে নিয়ে যাচ্ছে। আমি চোখে বেশি করে জল ছিটায় দিই।
আমার হাতে চাইরডা সোনার চুরি, দুইটা আংটি ছিল, এক জোড়া পাশা ছিল কানের। আর কিছু টাকা ছিল। জলে নামার আগে ওগুলা গোল গাছের ওখানে রাখিছি। ওদিকে দেখতেছি কি, পরিমলরে দাবড়ায়ে ওরা ওই পুকুরের মধ্যি ফেলে ছোরা দিয়া কোপ দিল। সে মরল না বাঁচল, সেটা আর দেখতি পারলাম না। এমন সময় কয়েকজন আসলো আমাগো কাছে, তাদের হাতে ছোরা। ছোরাতে রক্ত। আইয়া কচ্ছে কি, এই তোর কী আছে, দে। আমি তহন বলিছি, বাবা রে, যা আছে আমি দিচ্ছি। আমার কাছে নাই, ওই গোল গাছের গোড়ায় রাখিছি। আমি আনি দিচ্ছি। তহন সোনাদানা আইনে তাদের হাতে দিলাম। দিলে পরে ওরা চইলা গেল।

তারা কারা?
♦ পরে শুনছি তারা রজব আলীর লোক। রজব আলীরেও আমি দেহিছি। সে আমার শশুররে মারিছে। সে কথা পরে বলতেছি। আমারে পরে একজনে বলল যে ওই যে রজব আলী। ও তোমার শশুররে মারিছে। তহন তারে দেহিছি।

কে বলেছিল?
♦ সুন্দরপুরেরই এক মহিলা। সে রজব আলীরে চিনত। যা হোক, ওরা আমাদের সব নিয়াটিয়া চইলা গেল। আমার তো কোথাও যাওয়ার কায়দা নেই। বড় মেয়েটা আমার স্বামীর কোলে। ওর বয়স তখন সাত-আট বৎসর। আমার স্বামী আর বড় মেয়ের কোনো খোঁজ নাই। এমন সময় দেহি আমাদের সামনে দিয়া আমার বড় ময়েডা দৌড় দিয়া যাইতিছে। আমি ডাক দিছি পর সে আমাদের কাছে আইছে। আইসা আমার শাশুড়িরে বলল, ঠাকুরমা, বাবারে গুলি করি মারি ফেলছে।
মেয়ে বলিল, আমাদের গ্রামের লিয়াকত নাকি আমার স্বামীরে রজব আলীর লোকদের কাছে ধরায় দিছে। মেয়ে আরও বলিল যে আমার স্বামী লিয়াকতরে বলিছে, আমার জীবনটা ভিক্ষা দে। তুই আমার বন্ধু লোক। আমরা একসাথে বেড়াইছি, কত বল খেলিছি। দাদা, তুমি আমার জীবনটা ভিক্ষা দাও। তহন মাইয়াডারে নাকি ওর কোল থাকি নিয়া লিয়াকত ছুড়ে ফালায় দিছে। তারপর আমার স্বামীরে গুলি করিছে। এ সময় মেয়েটা দৌড়াই আইছে।
এই সময় আমাদের কেউরি চোখের জল নাই। আমরা তো পাষাণ হয়ে গেছি সব। আমার শশুর ছিল একটু দূরে। শশুর মশাইরে ডাইকা বললাম, আপনি আমাদের কাছে আসেন। আর কোন জাগায় যাবেন, এমনিতেই তো মরিছেন। আমাগো কাছে আসেন। তো উনি জলের মধ্যে নাইমা আমার কাছে আইসা দাঁড়ালেন। আমার শশুর আইছে পর আবার কয়েকটা লোক ওখানে আইয়ে কয়, এই শালা মালাউন, উঠ উঠ। আমাদের কাছে আয়। তখন আমরা ওদের কছি, দেহেন, একটা পুরুষ লোক আমাদের আছে। আর তো কেউ নাই। সব তো মারি ফালাইছেন। শুধু আমরা মহিলারা রইছি। আমরা কোথায় যাব, কী করব? ওনারে মারবেন না। উনি বুড়ো লোক। ওনারে মারবেন না। তারপরও ওরা আমার শশুররে উঠায়ে নিয়ে আমাদের সামনেই দড়াম করে গুলি করল। ওই লোকগুলার মধ্যে রজব আলী ছিল।

আপনার শশুরকে আপনাদের সামনেই গুলি করে হত্যা করল?
♦ আমার সামনেই মারল। অল্প কয়েক হাত দূরে। একটা গেঞ্জি ছিল তার গাঁয়। আর একখান সাদা ধুতি কাপড় পরা ছিল। গুলি করল এক্কেবারে বুকের উপর। গুলি লাগার সঙ্গে সঙ্গে আমার শশুর পড়ে গেল। তখন অল্প একটু বেলা আছিল। আমাদের গা কাঁপতেছিল। অন্ধকার হলি ওখান থাইকা আমরা উঠলাম। উইঠে আমরা কোথায় যাব, কী করব ভেবে পাই না। রাইত হইয়া গেছে। আমরা কোনো দিন ঘর থেকে বাইর হাই নাই। সব পুরুষ লোক মাইরে ফালায় দিছে। তারে যে সৎকার করব, সু সুযোগও নাই। আমরা ১০-১২ জন মেয়ে এক জাগায় জড়ো হলাম। এক জাগায় হয়ে রওনা হলাম। পথঘাটও চিনি না। শাশুড়ি আমার ডাইন হাতে ধরা। আর ছোট মেয়ে আমার কোলে। বড় মেয়েটাও আছে। আমাদের ভিজা কাপড়। এত কষ্ট কোনো দিন করি নাই। হাঁটতে হাঁটতে আমরা একটা গ্রামে গেলাম। শুনলাম, ওই গ্রামের নাম কাঁটাখালি।
সেহানে রাস্তায় দেহি একটা পুরুষ ছেলে আসতেছে। আমরা তারে জড়ায় ধরছি। ধরে বলছি, বাবা রে, তুই কি আমাগো মারবা। সে কয়, না মা, তোমাগো মারমু না। আমার দুইটা ভাইরে মাইরা ফেলায় দিছে। আমি তাদের খোঁজ নিতি যাচ্ছি।
তারপর আমরা একটা বাড়িতে গেলাম। দেখি, ওই বাড়িতে রেডিও বাজে। আর হেরিকেন ধরানো। ওই বাড়িতে যাইয়া কচ্ছি, মা, তোমরা আমাদের একটু জায়গা দাও। আমাগো সাথে কাচ্চাবাচ্চাও কিছু আছে। আমাগো একটু জায়গা দাও। তারা আর দরজা খোলে না। বহু অনুরোধ করার পর দরজা খুলিছে। ঘরের ভিতরে গেলি পরে একখান ওগলার চাট বিছাই দিছে বসতি। আমরা ভিজা কাপড়ে বসলাম।
বাচ্চাকাচ্চা খিদাতে কাইনতেছে। অনুরোধ করতি করতি তারা আমাদের কিছু চাইল দিল। লবণ-টবন দেয়নি। রাতে আমরা ওখানে থাকলাম। রাত পোহালেই তারা বলতি থাকল, তোমরা যাও, তোমরা চইলে যাও। তোমাগো জায়গা দিলে আমাগো মাইরা ফেলায় দিবে। এমন সময় দেহি কি, একটা বুড়ি আইসা কচ্ছে কি, ডাকরা ঠাকুরবাড়ির কোনো মেয়েছেলে আছে নাকি এই জায়গায়। তখন আমরা দৌড়ায়ে বের হলাম। দৌড়ে বেরোলেপরে সে কলো যে তোমার এক শাশুড়ি আমাগো বাড়ি আছে। সে আমারে পাঠায় দিছে, তাই আমি আইছি। তোমরা আমাগো বাড়ি চলো। তখন ওই মহিলার সঙ্গে আমরা সেই বাড়ি গেলাম।
ওটা সিদ্দিক মিয়ার বাড়ি। তারে আমরা চিনতাম। তার বাড়ি যাইয়া দেহি, আমার সেই শাশুড়ি আছে। আমার এক জা-ও আছে সেই বাড়িতে। আমরা গেলি পরে সিদ্দিক মিয়া তার বাড়ির লোকদের বলল, শিগগির এনাগো জায়গা দাও। কাপড়চোপড় দাও পরতি। খাওয়ার ব্যবস্থা করো। আমার শাশুড়িরে দেখে বলল, আপনিও আমার মা। সিদ্দিক মিয়ার বাড়িতে আমরা আশ্রয় নিলাম। সিদ্দিক মিয়া আমাদের খুব যত্ন করল। প্রায় দুই-আড়াই মাস ওখানে থাকলাম। আমাগো তারা সব দিছে। আমরা আলাদা রান্না করিছি। সিদ্দিক মিয়া আমাদের সাথে খুব ভালো ব্যবহার করিছে। আমার এক ভাশুর বাঁইচা গেছিল। সে ছিল বেতকাঁটায়। আমাদের খোঁজ পাইয়া সে সিদ্দিক মিয়ার বাড়িতে লোক পাঠাইছে। তখন আমার শাশুড়ি আর আমি বেতকাঁটায় গেলাম। পরে ইন্ডিয়া চলি গেছি। ওখানে শরণার্থী ক্যাম্পে ছিলাম। স্বাধীন হওয়ার পর দেশে আইছি।


সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহবুবুর রহমান
মার্চ ৫, ১৯৯৭

You may also like...