আজ শাঁখারিকাঠী গণহত্যা দিবস

জাহিদুল ইসলাম বুলু, কচুয়া প্রতিনিধি, শুভ দত্ত সৌরভ, বাগেরহাট প্রতিনিধি

মীর শওকাত আলী বাদশা


বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলার শাঁখারিকাঠী গ্রামে (এক সময় এখানে ছোট্ট একটি হাট বসত) গণহত্যা দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা, আবৃত্তি ও গণ সংগীত অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৫ নভেম্বর ২০১৮ বিকালে উপজেলার বাধাল ইউনিয়নের শাঁখারিকাঠী বদ্ধ ভুমিতে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি, বাগেরহাট-২ আসনের সাংসদ এ্যাড. মীর শওকাত আলী বাদশা।

প্রধান অতিথির পাশাপাশি বক্তব্য রাখেন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান হাজরা ওবায়দুর রেজা সেলিম, সদর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান শিকদার হাদিউজ্জামান হাদিজ, পিসি কলেজের সাবেক জিএস সরদার শুকুর আহমেদ, মুক্তিযোদ্ধা হাজরা জাহিদুল ইসলাম মন্নু, শিকদার হাবিবুর রহমান, সাবেক ইউনিয়ন চেয়ারম্যান খান আব্দুল কাদের, আওয়ামী লীগ নেতা কোতয়াল ইলিয়াস হোসেন, সরদার দেলোয়ার হোসেন, মজিবর রহমান শেখ প্রমুখ।

শিকদার হাদিউজ্জামান

বক্তব্য রাখছেন কচুয়া সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শিকদার হাদিউজ্জামান।

শ্রোতা দর্শক

স্মরণসভায় উপস্থিত শ্রোতাদর্শকদের একাংশ।

[শহীদ সন্তানদের আমন্ত্রণ না জানানোয় এবং তাদের বক্তব্য রাখার সুযোগ না দেওয়ায় অনেকেই ফোন করে ক্লোজআপনিউজের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, একইসাথে তারা অনুষ্ঠানে আগত অতিথিদের ধন্যবাদও জানিয়েছেন। শহীদ সন্তানেরা বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানিয়েছেন সাহিত্যিক, গবেষক, সাংবাদিক দিব্যেন্দু দ্বীপ কে, যিনি শহীদ সন্তান এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে শাঁখারিকাঠী গণহত্যার ওপর একটি বই প্রণয়ন করছেন, একইসাথে তিনি বাগেরহাট জেলায় ১৯৭১ সালে সংগঠিত গণহত্যার ওপর গবেষণা কর্মটি পরিচালনা করছেন।]

শাঁখারিকাঠী গণহত্যা

বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলার বাধাল ইউনিয়নের সর্ব দক্ষিণের একটি গ্রাম শাঁখারিকাঠি। গ্রামটি কচুয়া উপজেলা এবং মোরেলগঞ্জ উপজেলার মধ্যে সীমানা নির্ধারণকারী। শাঁখারিকাঠি (আলোকদি এবং শাঁখারিকাঠি গ্রামের সীমানায়) তখন একটি হাট বসত। ১৯৭১ সালে সেখানে সংগঠিত গণহত্যাটি শাঁখারিকাঠি নামে পরিচিতি পেলেও এটি আসলে ঘটেছিল অালোকদি গ্রামে। যেহেত ‘আলোকদি’ নামে আরেকটি গণহত্যা রয়েছে (ফরিদপুরে), তাই ‘শাঁখারিকাঠি’ নামটি সঠিকই হয়েছে, কারণ, স্থানটি পড়েছে আসলে তিন গ্রাম—অালোকদি, শাঁখারিকাঠি এবং সাগরকাঠির মধ্যবর্তী স্থানে।

শুক্র এবং সোমবার স্থানটিতে হাট বসত। সাধারণত পাশ্ববর্তী দুই তিন গ্রামের লোক ওখানে কেনাবেঁচা করতো। সেদিনও বাজার করতে গিয়েছিল কিছু নিরীহ মানুষ, তাঁরা ছিলো একেবারেই গ্রামের ক্ষুদ্র কৃষক শ্রেণির মানুষ অথবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, একেবারে ফড়িয়া ধরনের।

কাছের হাট হওয়ায় এমনও হতো বাড়িতে মা, কারো স্ত্রী হয়তো ভাত চড়িয়ে দিয়ে অপেক্ষা করছে তাঁদের ছেলে বা স্বামী হাট থেকে মাছ তরকারী নিয়ে আসলে রান্না করবে। সেদিনও সেরকমটি হয়েছিল অনেক বাড়িতে। ভুক্তভোগীদের বক্তব্য থেকে এরকম আরো অনেক হৃদয় বিদারক বিষয় জানা যায়।

এরকম হয়েছে যে একজন বাধোখালি (বাগেরহাট সদর উপজেলার একটি গ্রাম) থেকে পালিয়ে গিয়েছেন শশুরবাড়ি মোড়েলগঞ্জ উপজেলার বলভদ্রপুর গ্রামে, সেখানেও সমস্যা দেখে (বলভদ্রপুর গ্রামের কৃষ্ণ চক্রবর্তীর বাড়িতেও একটি গণহত্যা সংগঠিত হয়েছিল) পালিয়ে গিয়েছেন মামা বাড়ি অালোকদি গ্রামে। সেখান থেকে তিনি হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এই ব্যক্তির নাম কৃষ্ণ লাল হালদার। ঘটনার মাত্র মাস তিনেক আগে বিবাহ করে এভাবে তাকে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছিল। তারপরেও শেষ রক্ষা হয়নি!

১৯৭১ সালের ৫ নভেম্বর, শুক্রবার ১৮ কার্তিক ১৩৭৮ বঙ্গাব্দ রাজাকার বাহিনী উপরিউক্ত স্থানটিতে গণহত্যা সংগঠিত করে। ৪২জন ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষকে সেদিন হাতে হাত বেঁধে গুলি করে হত্যা করা হয়।

হত্যার পর এমনকি লাসগুলোও পাহারায় রেখেছিল রাজাকারেরা। পরের দিন লাসগুলো ঢিপ দিয়ে নৌকায় তুলে নিয়ে যায় রামচন্দ্রপুর গ্রামের খালের পাড়ে। ওখানে কোনোমতে লাসগুলো মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়। অনেক লাসের হাত পা মাথা বেরিয়ে ছিল, যেগুলো পরে শিয়াল শকুনে খেয়েছে।

ঘটনাস্থলে একটি স্মৃতির মিনার নির্মিত হয়েছে, কিন্তু সেটি অসম্পূর্ণ এবং ভুলবাক্য সম্বলিত। যে স্থানে বর্ব র এ হত্যাকাণ্ডটি সংগঠিত হয়েছিল সে জায়গাটিও এখন পরিবর্তন হয়েছে—সম্প্রতি সেখানে একটি ছাপড়া মসজিদ নির্মিত হয়েছে, স্থায়ী কিছু দোকানপাট উঠেছে, তবে হাটটি এখন আর বসে না।

গণহত্যায় সেদিন যারা নিহত হয়েছিলেন:

মতিলাল দাস, নিরঞ্জন দাস, নারায়ণ দাস, বাসুদেব দাস, অমর কৃষ্ণ পরামাণিক, বিনোদ দাস, দেবেন সাহা, কালু সাহা, প্রণব চন্দ্র দাস, নকুল চন্দ্র দাস, সাতো দাস, দুলাল চন্দ্র দাস, হরিপদ দাস, মহাদেব দাস, রামকৃষ্ণ দাস, অধীর কুমার দাস, সতীন্দ্র নাথ দাস, মণিলাল দাস, নিমাই চন্দ্র দাস, কালিপদ দাস, কুঞ্জলাল দাস, বাসুদেব দাস, কৃষ্ণ দাস, নিশিকান্ত দাস, দ্বিজবর দাস, শৈলেন্দ্র নাথ দাস, বসন্ত কুমার দাস, রাধাকান্ত দাস, শখিচরণ পাল, কুঞ্জলাল দাস, অনিল কৃষ্ণ দাস, বনমালী দাস, উপেন দাস, কার্তিক দাস, প্রফুল্ল কুমার সাহা ও সতীশচন্দ্র সাহা এবং আরও অনেকে।

স্বরোচিষ সরকার লিখিত বইয়ে শাঁখারিকাঠী গণহত্যায় শহীদের সংখ্যা ৫১। দিব্যেন্দু দ্বীপ বলছেন, স্বরোচিষ সরকার লিখিত বইয়ে কিছু নাম আছে যারা মূলত ঠিক ঐ স্থানটিতে সংগঠিত গণহত্যায় নিহত হননি, সে হিসেবে শাঁখারিকাঠী গণহত্যায় শহীদের সংখ্যাটি তিনি (মি. দ্বীপ) বলছেন ৪৭। শাঁখারিকাঠী গণহত্যার ওপর বইটি বের হলে শহীদের প্রকৃত সংখ্যা এবং তাদের পরিচয় সঠিকভাবে জানা যাবে বলে শহীদ সন্তানেরা বলেছেন।

নিচে শাঁখারিকাঠী গণহত্যা সম্পর্কে কথা বলছেন শহীদ মন্তান এবং গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী আনন্দ লাল দাস

শাঁখারিকাঠী গণহত্যা সম্পর্কে কথা বলছেন শহীদ সন্তান প্রত্যক্ষদর্শী অলকা রাণী দাস

১৯৭১ সালে রাজাকার-আলবদরেরা সংগঠিত করে শাঁখারিকাঠী গণহত্যা। গণহত্যায় অন্যান্যদের সাথে নিহত হন অলকা রাণী দাসের পিতা মহাদেব দাস। অলকা রাণী দাস সেদিন পিতার সাথে পাশ্ববর্তী হাটে গিয়েছিলেন, সেখানে হাতে হাতে বেঁধে ৪৭ জন লোককে রাজাকারেরা গুলি করে হত্যা করেছিল। হত্যাকাণ্ড এবং পরবতীর্তে তাঁদের জীবন সংগ্রাম নিয়ে কথা বলেছেন শহীদ সন্তান অলকা রাণী দাস। শাঁখারিকাঠী বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলার একটি গ্রাম। পাশে রয়েছে আলোকদি এবং মসনী গ্রাম। এই তিন গ্রামের সংযোগস্থলে তখন একটি হাট বসত। একেবারে গ্রাম্য হাট। সামান্য কেনা বেঁচা হতো। বিকালে হাটে বড়জোর দুশো তিনশো লোকের সমাগম হতো। এখানেই ১৯৭১ সালের ৫ নভেম্বর বর্বর হত্যাকাণ্ডটি সংগঠিত হয়। এই হত্যাকাণ্ডে মূলত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বেছে বেছে হত্যা করা হয়েছিল।

You may also like...