কে মেধাবী কীভাবে বুঝবেন?

লেখ শুরুমাজে সহৃদয় মানুষই সবচে বেশি প্রয়োজনীয় মানুষ। হৃদয়বান মানুষের মেধা যোগ্যতা বা চালাকি করার ক্ষমতা কতটা আছে সেটি মুখ্য বিষয় নয়, তারা যে সকল প্রাণীকে পৃথিবীতে ভালো রাখতে চান, কাজ করতে চান, তারা যে কপট হতে চান না, এর চেয়ে বড় সম্পদ আর কিছু হতে পারে না। 

আমরা যে মেধার কথা বলি, অর্থাত কে কত দ্রুত পড়াটা আয়ত্ব করতে পারে, কে কত দ্রুত সফলতার প্রচলিত সিঁড়িগুলো ভাঙতে পারে, এগুলো একেবারেই গড়পড়তা মানদণ্ড, এগুলো দ্বারা কারো চাতুর্যের পরীক্ষা যতটা নেওয়া সম্ভব, মেধার পরীক্ষা ঠিক ততটা নয়। 

তাছাড়া আরও অনেক লুকায়িত বিষয় আছে, যেগুলো হিসেবে আসে না, হিসেব করা সম্ভবও নয়। সকল ছেলেমেয়ের দায়িত্ব যদি একটা বয়সের পর রাষ্ট্র সমানভাবে নিতো এবং তার আগ পর্যন্ত (৫বছর) পরিবারের কাছেই সুযোগ সুবিধাগুলো রেশন হিসেবে পাঠিয়ে দিত, তাহলে শুরুতেই একটা ভারসাম্য তৈরি হতো। না হলে একজন না খেয়ে দশ কিলোমিটার হেঁটে স্কুলে যাবে, আরেকজন পেটে খাবার, বোতলে খাবার এবং ব্যাগে খাবার নিয়ে গাড়িতে করে স্কুলে যাবে; একজন বাসায়  এসে নিজে বইখুলে পড়ার চেষ্টা করবে, আরেকজন এক এক সাবজেক্ট এক এক মাস্টারের কাছে পড়বে; একজনের পিতামাতা অশিক্ষিত হবে, আরেকজনের পিতামাতা শিক্ষিত হবে; তাহলে কি প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়? একজন রোগাক্রান্ত হলে চিকিতসা পাবে, আরেকজন পাবে না; একজনের পিতা শেষ উপার্জনটুকু হারালে তার পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যায়, আরেকজনের পিতার অঢেল সম্পদ থাকায় পড়াশুনা ভালো না লাগলে বাদ দিয়েও বড় কিছু হয়ে যায়—নেতা বা বড় কোনো ব্যবসায়ী; তাহলে কি প্রতিয়োগিতার সুষম ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়? এই অসমতার সমাধান করা হয়েছে অবশ্য ঈশ্বর তত্ত্ব দিয়ে, সে অন্য আলোচনা, আরও বড় আলোচনা।   

এ পরিস্থিতিতে পরীক্ষার ফলাফল দেখে আমরা যা বুঝতে চাই তা কি আসলে মেধা যোগ্যতার তেমন কিছু তুলে ধরে? সামাজিক অবস্থান বিবেচনায় আমরা বুঝতে চাই তাও কি শুধুই অবিচার নয়? এর পাশাপাশি অনেক কথা রয়েছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে মুখস্থ বিদ্যার বিষয় নিয়ে। 

আসলে যখন মেধার কথা, সফলতার কথা বলে আমার হাসি পায়। আচ্ছা, ধরুণ, একটা প্রতিযোগিতায় একজনকে দেওয়া হলো বাইসাইকেল আর একজনকে দেওয়া হলো মটর সাইকেল, এরপর বলা হলো দেখি কে ফাস্ট হয়, তাহলে আপনি কি সেই প্রতিযোগিতাটা আপনি মেনে নেবেন? 
জীবনের দীর্ঘ দৌঁড়ে এইসব সফলতা এবং মেধার ব্যাপারটাও তাই, ওরকম অদ্ভুত ভীষণ অসম বিষয়গুলো জীবনের ক্ষেত্রে অদৃশ্য থাকে, তাই চোখে পড়ে না। ধরুণ, আপনি একটা পথ দিয়ে যাচ্ছেন, বিভিন্ন অনিয়ম এবং বিভিন্ন করুণ বিষয় দেখে থামলেন পাঁচবার, এবং আপনার বন্ধুও ঐ একই পথ দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সে থামলো না একবারও।
এবং আপনি এক্ষেত্রে খরচ করলেন ১০০টাকা, আপনার বন্ধু খরচও করলো না কিছু। তার মানে আপনি পিছালেন, তাই না? সুস্পষ্টভাবে টাকা, এবং সময় দুইদিক থেকেই পিছালেন। এখন একটু হিসাব মিলান তো, মেধা এবং সফলতা বিষয়ে, মেলাতে পারবেন?
তাই ব্যক্তি মানুষ যে সফলতার দাবী করে, সমাজ সেভাবে দেখলে চলে না, সমাজকের চোখ হতে হয় খুব সুক্ষ্ম, অনেকগুলো চলক বিবেচনায় রাখতে হয়।
প্রকৃতঅর্থে যে বেশি সেবা দেয়, যে বেশি উতপাদন করে সমাজের চোখে সে বেশি সফল হওয়া উচিত। অপরদিকে ব্যক্তি তার সফলতা মাপবে তার উপার্জন, খ্যাতি এবং পদাধিকারের ভিত্তিতে, যেগুলো শয়তানি এবং তোষামোদ দ্বারাও অর্জন করা যায়, চুরি করেও টাকা বাড়ানো যায়।
সমস্যাটা হচ্ছে, আমাদের সমাজের চোখটাও হয়ে গিয়েছে ঐ ব্যক্তি-সফলের চোখ, ফলে খুব একপেশে এবং বোকা বোকা চিন্তাভাবনা দ্বারা সমাজটা পরিচালিত হচ্ছে।

You may also like...