আড়ায় বক বসে দুইটা, কাক বসে শত শত

রেহমান সাত সকালে উঠেই দ্যাখে বাড়ির পেছনে জিয়ল গাছে মরা কচার উপর একটি কানি বক বসে বসে ঝিমোচ্ছে। শীতকালে বক শিকার করতে গেছে সে বহুকাল ধরে বহুবার, কিন্তু এতবড় বক সে খুব কম দেখেছে।

ঘরেই তার বক ধরার একটি ছিপ আছে। এটি তো একেবারে হাতের নাগালে, তাই শেষ কুঞ্চিটিই যথেষ্ট। কুঞ্চিতে কুঞ্চি গেঁথে ওটি একটি লম্বা বাঁশের ছিপের মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ শীতকালে বক শিকার করে।

শেষ কুঞ্চির মাথায় ধারালো লোহা পুতে রাখা হয়। ওটি দিয়ে আঘাত করে বক শিকার করা হয়। রেহমান ঘর থেকে ধারালো লোহা গাঁথা কুঞ্চিটি এনে পিছন থেকে ঘা মেরে বকের পিঠে গেঁথে দিয়ে বকটিকে নামিয়ে আনে।

বকটি ছটফঁটানোর চেষ্টা করতে থাকে, রেহমান দ্রুতই “আল্লাহু আকবর” বলে বকটির গলায় ছুরি চালিয়ে দেয়।

ঘরের ভেতর থেকে রেহমানের বউ খুশিতে চিৎকার দিয়ে দৌঁড়ে বাইরে আসে। মাংস কালেভদ্রে কিনে তারা খেতে পারে, এভাবে বড় একটি পাখি মাংস হিসেবে পেলে তাদের খুশি হওয়াটা অমানবিক নয় মোটেও।

শিকার করা দেখতে এবং শুনতে যত খারাপ শুনায় করতে তত খারাপ না, সত্য হল, খাওয়ার সময় হলে এ সভ্যতায় এখনও মিলে যায় আসামী এবং ফরিয়াদী এক টেবিলে।

খুশি হতে পারছে না শুধু রেহমানের নয় বছরের ছেলেটি। কিছুতেই ও দুপুরে বকের মাংস খায়নি। রেখে দিয়ে রাতেও খাওয়াতে পারেনি।

আশ্চার্য ব্যাপার! পরের দিন একই জায়গায় আরেকটি বক এসে বসে। রেহমান একই কায়দায় বকটিকে পেড়ে আনে। মানুষ কি আর মূল্য দেয় বকের বিরহ! সতীর্থ মানুষই বা কতটুকু মূল্য পায় মানুষের কাছে!

জোড়ের বক, আকার-আকৃতি প্রায় তাই একই। তবে এটি তুলনামূলক একটু বড়। সম্ভবত এটি পুরুষ বকটি।

বকটিকে দ্রুত আঘাত করে পাড়তে গিয়ে জিয়ল গাছের মরা ডালটিও ভেঙ্গে যায়। খুব দুঃখ পায় রেহমান। তার ধারণা হয়েছে, রোজ একটি করে বক এসে বসবে এই ডালে।

রেহমান সোজা মাথায় সোজা চিন্তা করে। জিয়ল গাছের ঐখানটাতে সে সুন্দর করে একটি বাঁশের আড়া বেঁধে দেয়। মরা ডালটির চেয়ে অনেক লম্বা, সোজা একটি আড়া। আরও বেশি বক বসবে নিশ্চয়ই এখানে এখন …

পরের দিন সকালে সে উঁকি দেয়, কিন্তু বক বসেনি আজ। আশেপাশে দুএকটি কাক ঘোরাফেরা করছে, খাবার পরে বকের মাংসের উচ্ছিষ্টাংশ বাড়ির আশপাশ দিয়ে কুড়িয়ে খাচ্ছে কাকগুলো।

এরপরের দিনও কোনো বক আসেনি, কিন্তু প্রচুর কাক এসে ভিড় করেছে ঘরের পেছনে বাগানটাতে। কিছুক্ষণ পর অনেকগুলো কাক এসে ভিড় করে বেঁধে দেওয়া বাঁশের আড়াটাতেও।

এভাবে প্রতিদিন কাকের সংখ্যা বাড়তেই থাকে। রেহমান বিস্মিত হয়। রেহমানের বউ ছিন্নি মানত করে যাতে কাকগুলো চলে যায়।

ছেলেটি বারে বারে ঘরের পেছনে গিয়ে কী যেন দেখে আসে। ও শিকার করা দ্বিতীয় বকটির মাংসও খায়নি, এবং কোনোদিন বকের মাংস খাবে না বলে ভেবেছে।

রাতে রেহমান এবং তার স্ত্রী দুজনই খুব বিষন্ন হয়ে থাকে। আক্কাস এসে ভয়ে ভয়ে পিতাকে বলে, আব্বু, ঐ আড়াডা খুইলা ফ্যালো, দ্যাখবা সব কাক চইলা গ্যাছে। রেহমান ধমক দিয়ে ছেলেকে থামায়।

“বেশি পণ্ডিত হইছস, যা কাম করগে গিয়ে, সুপারিগুলো ফোড়, কাইল হাটে বেঁচতে হইব।”

স্বপন বিমর্ষ হয়ে চলে যায়। ও মনে মনে নিশ্চিত হয়, ভাবে, ঐ আড়াডা খুইলা ফ্যাললে কাকগুলো চলে যাইবই। ওইটির লাইগাই কাকগুলো এইভাবে একত্র হইতে পারছে।

আড়াডা ভাইঙ্গে ফ্যালতে হইবই। ও দুটো দলনেতা টাইপের কাককে আড়ার মাঝখানে বসে ফিসফাস করতে দেখেছে আজকে।

পরের দিন সকালে কাকের সংখ্যা যেন আরও বেড়েছে, এমনিতেই বাড়িটা একটু নির্জন জায়গায়, তার ওপর দুপুরবেলা কাকের চিৎকারে পুরো বাড়িটা একটা ভূতের বাড়ি হয়ে উঠেছে!

বিলকিস অমঙ্গলের আশংকায় অস্থির হয়ে থাকে। রেহমান কাকগুলো মাঝে মাঝে তাড়া করে আবার ফিরে আসে, কোনো লাভ হয় না। আবার নতুন কাক এসে বসে আড়ায় এবং বাগানজুড়ে।

রেহমান হাটে গিয়েছে। এই ফাঁকে গাছে উঠে দড়ি কেটে আড়াটি নামিয়ে আনে স্বপন। টানতে টানতে ওটি বাগানের আরো ভেতরে নিয়ে কেটে দুই ভাগ করে ফেলে দেয়।

কাকগুলো রোজ দুপুরের পর এমনিতেই চলে যায়। তাই একদিন না গেলে বোঝা যাবে না, আসলেই আড়াটি কেটে ফেলাতে কাজ হয়েছে কিনা।

রেহমান হাট থেকে ফিরে এসে দেখে গাছে আড়া বাঁধা নেই। সারা বাড়ি মাথায় তোলে সে। বিলকিসকে খানিকক্ষণ বকাঝকা করে ঝিম ধরে বসে থাকে। মনে করে, কেউ হয়ত এত ভালো দেখে ওটি চুরি করে নিয়ে গেছে।

খেলাধুলা শেষে স্বপন বাড়ি ফিরলে রেহমান আড়াটির কথা জানতে চায়। স্বপন অকপটে স্বীকার করে। সাথে সাথে রেহমানের মাথায় রক্ত চড়ে যায়।

সে মইয়ের কোয়া দিয়ে স্বপনকে আঘাত করতে থাকে। একটি আঘাত খুব জোরে মাথায় লাগে, স্বপন ‘মা’ বলে চিৎকার করে পড়ে যায়।

কিছুক্ষণ পরে স্বপন জ্ঞান হারায়। ওকে জেলা সদরে একটি ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সিটি স্কানের ফলাফল খুব খারাপ এসছে। কোমায় চলে গেছে ছেলেটি।

রেহমান বাড়ি ফিরে আসে। সারা রাত কেঁদে কাটায়। সে অপেক্ষায় থাকে কখন ভোর হয়। দেখতে চায়, সত্যিই কাকগুলো আর আসে কিনা।

প্রতিদিন রাত না পোহাতেই কাকগুলো চলে আসে। ঠিকই আজ আর আসেনি। রেহমান আরো অপেক্ষা করে, সত্যিই কোনো কাক আর আসেনি।

হঠাৎ কী ভেবে কী হল! রেহমান পাগলের মত হয়ে যায়। সে চিৎকার করতে থাকে−

আমার ছেলে ঠিক বলেছে,

আড়া ছিল বলে কাক ছিল।

আমার ছেলে ঠিক বলেছে,

আড়া ছিল বলে কাক ছিল।

আড়ায় আর বক বসে না, কাক বসে।

আড়ায় বক বসে দুইটা, কাক বসে শত শত।

ভেঙ্গে ফ্যালো! ভেঙ্গে ফ্যালো!

আমার ছেলে ঠিক বলেছে,

আড়ায় আর বক বসে না, কাক বসে।

আড়ায় বক বসেছিল দুইটা, কাক বসে শতশত।

 


দিব্যেন্দু দ্বীপের ছোটগল্প সংকলন থেকে সংগৃহীত

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *