উত্তপ্ত মহাসড়ক থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সফল হয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের উৎপল দত্ত

মার্কিন মহাসড়ক থেকে বিদ্যুৎ, উদ্ভাবক বাংলাদেশ পুলিশের উৎপল

মার্কিন মহাসড়ক থেকে বিদ্যুৎ, উদ্ভাবক বাংলাদেশ পুলিশের উৎপল

শহর ছাড়িয়ে জনমানবশূন্য প্রান্তর দিয়ে চলে গেছে মহাসড়ক। সেই সড়ক ধরে দূর গন্তব্যে ছুটে চলেছে গাড়ি। সড়কের দুপাশে নেই বিদ্যুৎ সুবিধা দেয়ার মত কোনো অবকাঠামো।এসময় হঠাৎই গাড়ির ব্যাটারি, অতি প্রয়োজনীয় স্মার্টফোনটির চার্জ গেলো ফুরিয়ে কিংবা দুর্ঘটনার শিকার একটি গাড়ির কারণে লেগে গেলো ট্রাফিক জ্যাম। অথচ ট্রাফিক পুলিশের কাছে এই জ্যামের খবরই পৌঁছালো না। কারণ বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অভাবে ওই সড়কটি আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থার পর্যবেক্ষণকারী সব প্রযুক্তি সুবিধার বাইরে।

বর্তমানে এরকম সংকটের সমাধান সৌর বিদ্যুতের প্যানেল। তবে এই ব্যবস্থা বেশ ব্যয়বহুল। তাই পিচঢালা মহাসড়কটিকেই মহাউপকারী বিদ্যুৎ শক্তির উৎসে পরিণত করলে কেমন হয়? আপাততঃ কল্পবিজ্ঞান মনে হলেও এই কল্পনাকেই সত্যে পরিণত করার উপায় দেখালেন বাংলাদেশ পুলিশের কর্মকর্তা উৎপল দত্ত।কালোপিচের রাস্তায় সূর্যের প্রখর তাপ এবং যানবাহনের চাকার ঘষায় উৎপাদিত তাপকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগিয়ে তিনি পেয়েছেন প্রাথমিক সাফল্য।মহাসড়ক-রানওয়ের উপরিভাগের তাপ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে তার এই উদ্ভাবনী প্রযুক্তিকে সেরা উদ্ভাবন হিসেবে স্বীকৃতি জানিয়েছে আমেরিকান সোসাইটি অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স এবং মার্কিন ট্রান্সপোর্টেশন রিসার্চ বোর্ড।

বাংলাদেশ পুলিশের সহকারী কমিশনার উৎপল দত্ত

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া উৎপল দত্ত ৩০তম বিসিএস-এ উত্তীর্ণ হয়ে পুলিশের সহকারী কমিশনার হিসেবে যোগ দেন। ৪ বছর দেশে দায়িত্ব পালনের পর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় অত্যাধুনিক সংস্করণে আগ্রহী উৎপল পড়তে যান যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ইউনিভার্সিটিতে। বিশ্ববিদ্যালয়টির সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক সামের দেসোওকির তত্ত্বাবধানে এই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন তিনি।

টেক্সাসে শুরু করা উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলোর জন্য তাকে আরও কিছুদিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে হবে। তাই ছুটির মেয়াদ বাড়াতে কয়েকদিন হলো দেশে এসেছেন পুলিশের এই তরুণ অফিসার।

রাজারবাগ পুলিশ লাইনে চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে কথোপকথনে নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনে নিজের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি, বাংলাদেশের ট্রাফিক ব্যবস্থায় প্রযুক্তি নির্ভরতা বাড়িয়ে অপচয় রোধের সম্ভাবনার কথা।

মার্কিন মুলুকে উৎপলের ‘পিই-কুল’
উৎপল জানান, বিগত দেড় দশক ধরে তাপশক্তি থেকে বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদনে প্রচুর গবেষণা চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় রাস্তার উপরিভাগ থেকে শক্তি সংগ্রহের একটি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন তিনি। এই প্রযুক্তির কাগুজে নাম ‘পেভমেন্ট এনার্জি হারভেস্টিং অ্যান্ড কুলিং (পিই-কুল) সিস্টেম’।

তিনি বলেন, ‘এর সাহায্যে রাস্তার সার্ফেস (উপরিভাগ) থেকে তাপশক্তি আহরণ করে আহরিত শক্তিকে থার্মো ইলেকট্রিক জেনারেটরের মাধ্যমে অবিরত বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করা সম্ভব হয়েছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তবতা তুলে ধরে সেদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়া এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, বিস্তৃত হাইওয়ের সবজায়গায় সেন্সর, ক্যামেরা, পর্যবেক্ষণ টুলসের মতো অত্যাধুনিক ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট প্রযুক্তি স্থাপন বেশ কঠিন। অন্যদিকে বিপুল অর্থেরও প্রয়োজন আছে।

রাস্তার উপরিভাগের এই তামার পাত দিয়েই তাপ চলে যাবে থার্মো ইলেকট্রিক জেনারেটর এবং হিট সিংকে। উৎপাদিত হবে বিদ্যুৎ।

এমন অবস্থায় রাস্তাকেই বিদ্যুৎ যোগানের উৎসে পরিণত করতে এরকম উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার উদ্ভাবিত ডিভাইসটি একটি নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনকারী ডিভাইস। যা দৈনিক গড়ে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত একনাগাড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। রাস্তার তাপকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্পূর্ণ নতুন একটি গবেষণাক্ষেত্র। আমরা যে মডেল বা প্রোটোটাইপ উদ্ভাবন করেছি সেটা প্রথমে কম্পিউটার সিম্যুলেশনের মাধ্যমে দাঁড় করিয়েছিলাম। উদ্ভাবিত ডিভাইসটির তিনটি অংশ: এনার্জি হার্ভেস্টার, থার্মো ইলেকট্রিক জেনারেটর এবং হিট সিংক।

ডিভাইসটি পরীক্ষামূলকভাবে মহাসড়কের ধারে স্থাপন করা হয়। রাস্তার পিচের এক ইঞ্চি নিচে এনার্জি হার্ভেস্টারটি (তামার প্লেট) থাকবে।

এটা রাস্তার তাপ গ্রহণ করে ঠিক রাস্তার পাশে মাটির এক-দেড় ফুট নিচে থাকা মূল অংশে পৌঁছে দেবে। ডিভাইসের দ্বিতীয় স্তরে থাকবে থার্মো ইলেকট্রিক জেনারেটর এবং এর নিচেই হিট সিংক। রাস্তার উপরিভাগের তাপ এবং মাটির নিচের ঠান্ডা এই দুই এর পার্থক্যকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করবে থার্মো ইলেকট্রিক জেনারেটর।’

আপাততঃ যে সাফল্য
ল্যাবে এবং রাস্তায় ডিভাইসটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সাফল্য পেয়েছেন উৎপল। তিনি জানান, গবেষণায় দেখা গেছে ডিভাইসটি রাস্তার প্রতি বর্গফুট উপরিভাগ থেকে ৩০০-৩৫০ মিলিওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে।

প্রাথমিক পর্যায়ে এই সাফল্য যে কম নয় সেটাই স্বীকৃতি পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বড় দুটি উদ্ভাবনী প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায়। আমেরিকান সোসাইটি অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স এর ইনোভেশন কনটেস্টে তাই দুই ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে বাংলাদেশের এই পুলিশ কর্মকর্তার উদ্ভাবনী উদ্যোগটি। একই সঙ্গে মার্কিন ট্রান্সপোর্টেশন রিসার্চ বোর্ডের এয়ারপোর্ট কোঅপারেটিভ রিসার্চ প্রোগ্রামেও সেরা ডিজাইন হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে।

বাংলাদেশের ট্রাফিক ব্যবস্থায় তিনি চান প্রযুক্তির উন্মেষ
বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে দেশের জন্য দায়িত্ব পালনের দায় থেকেই পুলিশে যোগ দেন বলে জানান উৎপল।

নিজের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে পেশা জীবনে কাজে লাগিয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থায় প্রযুক্তি বিপ্লব ঘটিয়ে দেশের জনবল-অর্থের অপচয় কমাতে চান তিনি।

ট্রাফিক ব্যবস্থা বদলে নিজের স্বপ্নের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ঢাকায় পুরো ট্রাফিক কন্ট্রোল করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। উন্নত দেশের আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি নিয়ে আমার আগ্রহ বরাবরই আছে। আসলে আমার এই ডিভাইসটি তো মাত্র শুরুর একটি পদক্ষেপ। উন্নত দেশের মতো আমাদের দেশের সড়কেও যদি ট্রাফিক পর্যবেক্ষণ সেন্সর স্থাপন করা যায় তাহলে সড়কে শৃঙ্খলা সহজ হয়ে যাবে। ঈদে বাড়ি ফেরা মানুষের মহাসড়ক জটেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে পুলিশ।’

”এখনো ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমার গবেষণা শেষ হয়নি। আরও সময় নিয়ে বিদ্যুৎ সংকট দূর করা, দেশের অর্থ অপচয় কমিয়ে রাস্তায় একটি ভালো ব্যবস্থাপনা দাঁড় করাতে পারলে রাষ্ট্রের কাজে আসে এমন কাজে লেগে থাকতে চাই।’’

সূত্র: চ্যানেল আই

Share on FacebookTweet about this on TwitterShare on Google+Email this to someonePrint this page

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *