শুধু মানের বিচারে ক্যাডার পছন্দ করবেন নাকি আপনার চরিত্র বিচারেও?

হাজার বছর আগে চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াস একটা কথা বলেছিলেন, “এমন একটি কাজ খুজে নাও যেটা তোমার ভাল লাগে। দেখ, বাকি জীবনে আর তোমাকে কাজ করতে হবে না।”

কথাটার মর্মার্থ এই, কাজ হতে হবে ব্যক্তির ভাললাগার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর তা তখনই সম্ভব যখন সে কাজের ধরণটি আপনার ব্যক্তিত্ব, আপনার চিন্তা-ভাবনা, ভাললাগা, জীবন দর্শন ইত্যাদির সাথে মানানসই হয়।

অর্থাৎ, কাজটি আপনার সাথে যায় কিনা সেটা মূল বিবেচ্য বিষয়। অপরদিকে কাজের ধরণটি যদি হয় আপনার ব্যক্তিত্ব বা বৈশিষ্ট বিরোধী, তাহলে তা হয়ে উঠবে সারাজীবনের অভিশাপ। কেননা, মানুষ কোনো একটি চাকরিতে প্রবেশ করার পর থেকে যৌবন, মধ্যবয়স, এমনকি বার্ধক্যেরও একটা সময় পর্যন্ত –জীবনের সব থেকে বড় অংশ কাটে চাকরি সংশ্লিষ্ট কাজে।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পাড়ি দেবার পর পুরো সমাজ ও পরিবার যখন আপনার দিকে তাকিয়ে আছে প্রতিষ্ঠিত হবার দৃশ্যটি দেখার জন্য তখন আপনি খুব অগোচরেই হারিয়ে ফেলেন আপনার নিজস্বতা। আপনি হয়ে ওঠেন সমাজ ও পরিবারের ইচ্ছে পূরণের যন্ত্রমানব।

তখন যেকোনো একটা মানসম্মত চাকরি পেয়ে সমাজ ও পরিবারের এই চাহিদা পূরণ করাই হয়ে ওঠে তখন একমাত্র আরাধ্য। আর তাই বিসিএস পরীক্ষার আবেদন করার সময় ক্যাডার চয়েজ দেবার সময় আপনি ভাবেন চাকরি পাবো কি পাবো না তার নাই ঠিক, চয়েজ এ কী আসে যায়?

কিংবা ভাবেন একটা চাকরি হলেই বেঁচে যাই। হোক তা প্রশাসন, পুলিশ কিংবা খাদ্য, মৎস বা সমবায়। এভাবে একসময় সেই ক্ষণটাও আসে যখন বলার সুযোগ হয়, চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বেলা শুনছো?

কিন্তু তারপর?

যদি এমন হয় যে যেদিন থেকে চাকরিতে ঢুকলেন হতাশা আপনাকে আঁকড়ে ধরলো সারাজীবনের জন্য, তখন কী হবে? এজন্য ক্যাডার নির্বাচনে ক্ষেত্রে আপনার ব্যক্তিত্বের ধরণ অনুযায়ী ক্যডার নির্বাচন করা খুবই জরুরী।

আপনার চরিত্রের ধরণ নির্ধারন যেভাবে করতে পারেন–
আপনি যেমন তাইই আপনার ব্যক্তিত্ব। কোন মনোবৈজ্ঞানিক সংজ্ঞায় না গিয়ে কিছুটা কমনসেন্স কাজে লাগিয়ে নির্ধারণ করুন আপনার ব্যক্তিত্ব।

ব্যক্তিত্ব
প্রথমেই ভাবুন আপনি মানুষের সাথে মিশতে, আড্ডা দিতে, সামাজিক কর্মকাণ্ড করতে, দলীয় কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন কিনা? যদি উত্তর হয় হ্যাঁ, তাহলে আপনি বহির্মুখী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। আর একা থাকতে পছন্দ করলে, সামাজিক বা দলীয় পরিবেশে স্বাচ্ছন্দবোধ না করলে আপনার ব্যক্তিত্ব হলো অন্তর্মুখী।

ঝোঁক
নিজেকে প্রশ্ন করুন আপনি কোন ধরনের কাজ করতে পছন্দ করেন? এটা করার সহজ উপায় হল, আপনার এ যাবৎ বিভিন্ন পর্যায়ে (স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, কোনো চাকরি করে থাকলে সেখানে) আপনি কোন ধরনের কাজগুলো করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছেন। তাহলে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন আপনার ঝোঁক কোন ধরনের কাজের প্রতি।

জীবনদর্শন
প্রত্যেকটি মানুষেরই তার জীবন সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। কেউ সেটাকে চিন্তা কওর আবিষ্কার করেছে কেউ করেনি, কিন্তু লুকায়িত আছে। জীবন দর্শন বলতে মানুষ হিসেবে আপনার জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, আপনার সমগ্র জীবন শেষে নিজেকে কোন জায়গায় দেখতে চান, জীবনের শেষ বেলায় চাওয়া পাওয়ার হিসেবটা কি ধরনের হতে পারে, আপনার কাজের মাধ্যমে আপনি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অর্জনকে গুরুত্ব দেন নাকি আপনার কর্মের সামগ্রিক একটি প্রভাব রাখতে চান সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর, আপনার সমাজ ভাবনা, জীবনবোধ ইত্যাদি শত শত বিষয় এর অন্তর্ভুক্ত। একটু ভেবে নিন এ বিষয়টা। সিদ্ধান্ত নিতে তবে আর ভুল হবে না আশা করি।

আবেগ
আবেগ একটি সার্বজনীন বিষয় এবং মানুষ মাত্রই আবেগ সর্বস্ব। কিন্তু সে আবেগের কয়েকটি বিষয় প্রতিদিনের জীবনে খুব জরুরী হয়ে পড়ে পারস্পারিক যোগাযোগ ও মিথস্ক্রিয়ার (ইনটারেকশন) ক্ষেত্রে। প্রথমত, আবেগের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। একেক জনের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা একেক রকম। কেউ অল্পতেই রেগে যান বা প্রতিক্রিয়া করে বসেন আবার কেউ চাপ সহ্য করে ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করে যেতে পারেন।

আবার অনেকেই অনেক বেশী সংবেদনশীল হয়ে থাকেন, কেউ কম সংবেদনশীল। নিয়ন্ত্রিত আবেগ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আপনাকে বুঝতে হবে আপনি কতটা আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, অন্যের আবেগ বোঝার ক্ষমতা। আপনি কতটা অন্যের আবেগ বুঝতে পারেন (যেটাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ইমোশনাল ইনটিলিজেন্স), সেটা আপনাকে বিশ্লেষন করতে হবে।

চরিত্র অনুযায়ী ক্যাডার নির্ধারন
উপরের বিষয়গুলো নিয়ে একটু ভাবার পর এবার আসুন বিসিএস এ ক্যডার পছন্দের বিষয়টিতে। বিসিএস-এ সর্বমাট ক্যাডার রয়েছে ২৭ টি। ২৭ টি ক্যাডার মানে সাতাশটি ভিন্ন ভিন্ন দিগন্ত। এবার ক্যডারভিত্তিক আলোচনা করা যাক আপনার ব্যক্তিত্বের সাথে তুলনা করে।

বিসিএস প্রশাসন
বিসিএস পরীক্ষায় একটি বৃহৎ অংশ, ঝোঁকের বশে হোক আর জনশ্রুতির দ্বারা প্রভাবিত হয়েই হোক, তাদের ক্যডার পছন্দের তালিকায় প্রশাসন ক্যডারকে শীর্ষে রাখে। আসুন জেনে নেওয়া যাক প্রশাসন ক্যাডারের কাজের রকম সম্পর্কে। প্রশাসন ক্যাডারকে বলা হয় ডাইনামিক ক্যাডার। কারণ, এ ক্যডারের বিস্তৃতি এতটা ব্যাপক যে একজন চাইলে একটি চাকরি মাধ্যমেই অনেকগুলো চাকরির স্বাদ পেতে পারে।

তবে এ চাকরিতে আপনাকে হতে হবে প্রচণ্ড বহির্মুখী, সামাজিক যোগাযোগে দক্ষ, থাকতে হবে অন্যের আবেগ অনুভূতি বুঝতে পারার সক্ষমতা, প্রচণ্ড শারীরিক ও মানসিক চাপ নেবার ক্ষমতা, নেতৃত্বদানে পারদর্শিতা, বাগ্মিতা ইত্যাদি। এছাড়া আপনার আগ্রহের জায়গাতে সামগ্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা, সমাজ ব্যবস্থা, অর্থনীতি, রাজনীতি, সরকার ব্যবস্থা ইত্যাদির অবস্থান আছে কিনা এটিও একটি বিবেচ্য বিষয়।

এ পেশাটি পছন্দের ক্ষেত্রে আপনার ব্যক্তিগত চরিত্রে উপরোল্লিখিত বৈশিষ্টসমূহ থাকলে আপনি প্রশাসন ক্যাডারের একজন সদস্য হয়ে নিজের সন্তুষ্টির জায়গাটি যেমন নিশ্চিত করতে পারেন তেমনি আপনিও হয়ে উঠতে পারেন দেশ ও জাতির মানবসম্পদ। আর যদি শুধুমাত্র ক্ষমতার মোহে আবিষ্ট হয়ে এবং অন্যসব বৈশিষ্ট্যাবলীর অধিকারী না হয়ে এ চাকরিতে প্রবেশ করেন তবে সেটি হবে আপনার জীবনের অন্যতম ভুল সিদ্ধান্ত।

বিসিএস (পররাষ্ট্র)
আপনি কি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বিশ্বব্যবস্থা, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহী? আপনি কি দেশে দেশে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন? আপনি কি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেন? তাহলে পররাষ্ট্র ক্যডার হতে পারে আপনার প্রথম পছন্দ। কিন্তু যারা হোমসিক (দেশে থাকার ব্যপারে দুর্বল), পরিবার ছেড়ে দীর্ঘদিন বাইরে থাকতে পারেন না কিংবা দেশ থেকে দূরে থাকতে মন পোড়ায় তাদের এ ক্যাডারে না আসাই শ্রেয়।

এ ক্যাডারে যে সকল ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য প্রয়োজন তা হলো, দূরদর্শিতা, আন্ত-সাংস্কৃতিক পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেবার ক্ষমতা, ইংরেজি ও বাংলা উভয় মাধ্যমে যোগাযোগে পারদর্শিতা, আন্তঃরাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে আগ্রহ ইত্যাদি। দেশের প্রতি কমিটমেন্ট ও দক্ষ কুটনীতির মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেবার মত মনোবাসনা থাকলে আপনি এ ক্যাডারে থেকে দেশের জন্য অনেক অবদান রাখতে পারবেন।

বিসিএস (পুলিশ)
ছেলেবেলা থেকে একশন ফিল্ম, টিভি সিরিজ দেখে দেখে কিংবা গোয়েন্দা কাহিনী শুনতে শুনতে অনেকে মনে মনে ইচ্ছে পোষণ করে বড় হয়ে পুলিশ হব। সেটা হল ফ্যন্টাসি। ফ্যন্টাসির জগৎ থেকে বাস্তবতার দুনিয়া অনেকটাই আলাদা। বাংলাদেশ একটি তৃতীয় বিশ্বের দেশ যা দরিদ্রতা, জনসংখ্যা সমস্যা, পরিবেশ বিপর্যয়, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, জঙ্গিবাদসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত। আর এমন একটি দেশে পুলিশিং কল্পকাহিনীর জগতের পুলিশ কিংবা উন্নত দেশের পুলিশিং-এর চেয়ে অনেক বেশী চ্যলেঞ্জিং।

আকর্ষনীয় পোষাক, অস্ত্র আর বাহ্যিক দাপট দেখে অনেকে এ পেশার প্রতি আকৃষ্ট হলেও এর আড়ালে রয়েছে নানাবিধ চ্যালেঞ্জ। একজন পুলিশের যেমন রয়েছে উত্তেজনাকর পেশাগত অভিজ্ঞতা নেবার সুযোগ তেমনি আছে অমানসিক পরিশ্রম। প্রথমত, এ পেশার দায়িত্ব এবং ঝুঁকি অনেক বেশী। তাই পুলিশ তালিকার প্রথম পছন্দে আনার ক্ষেত্রে দায়িত্ব এবং ঝুঁকি নেবার মত মানসিকতা থাকতে হবে।

দ্বিতীয়ত, এ পেশায় কোন সময়সীমা নির্ধারিত নেই। আপনি এ পেশায় আসা মানেই হলো ২৪/৭ জনসেবায় নিয়োজিত থাকা। সেক্ষেত্রে ভেবে দেখতে হবে পারিবারিক আর ব্যক্তিগত জীবন থেকে সময় উৎসর্গ করতে আপনি কতটা প্রস্তুত।

তৃতীয়ত, চরম বিপজ্জনক বা ক্রাইসিস পরিস্থিতিতে আপনি কতটা মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারেন –এটি পুরোপুরি আপনার আবেগ নিয়ন্ত্রণের সাথে জড়িত। বিভিন্ন শ্রেণির নানা ধরনের অভিযোগ, চাপ আর কঠিন পরিস্থিতিতে আপনাকে থাকতে হবে ঠাণ্ডা মেজাজে। ধৈর্য থাকতে হবে অসীম।

চতুর্থত, আপনার হতে হবে সামাজিক যোগাযোগে পটু আর বহিমুর্খী চরিত্রের অধিকারী। প্রতিদিন নানা ধরণের মানুষকে আপনার ম্যানেজ করতে হবে এ পেশায়। চূড়ান্তভাবে আপনার থাকতে হবে শারীরিক সক্ষমতা ও সামর্থ। চাকরিতে প্রবেশের সাথে সাথেই দীর্ঘ শারীরিক শ্রমসাধ্য কঠিন প্রশিক্ষণ আর চাকরিকালীন প্রতিদিনকার শারীরিক ও মানসিক চাপ নেবার প্রস্তুতিটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

একটু ভেবে নিন পছন্দটি করবার আগে আপনি ঠিক এই টাইপের মানুষ কিনা। আপনার চরিত্রের সাথে বৈশিষ্ট্যগুলো গেলে আপনি অনায়াসে বেছে নিতে পারেন উত্তেজনাময়, চ্যলেঞ্জিং এ পেশাটি। আর আপনার বৈশিষ্ট্যের সাথে না মানালে এ পেশায় না যাওয়াই শ্রেয়।

বিসিএস (কর) ও বিসিএস (কাস্টমস)
দেশের উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম হল সঠিকভাবে কর, ভ্যাট ও শুল্ক আদায়। আর এগুলো আদায়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পিত রয়েছে এ দুটি ক্যডারের উপর। এ দুটি ক্যডারে কাজ করতে হলে যেসমস্ত চরিত্রের অধিকারী হতে হবে: হিসেবপত্র, ব্যবসা-বানিজ্য, অর্থনৈতিক লেনদেন, খুটিনাটি নথিপত্রের কাজকর্মে আগ্রহী ও দক্ষতা। অনেকের কাছে এ কাজগুলো একঘেয়েমী মনে হতে পারে। আবার অনেকে এমন কাজ করতে পছন্দ করেন না যেহেতু এটি অধিকতর দাপ্তরিক আর জনসংশ্লিষ্টতা অপেক্ষাকৃত কম (পুলিশ বা প্রশাসনের তুলনায়)। এ দুটি চাকুরি অর্ন্তমুখী, লাজুক আর নির্ঝঞ্ঝাট ব্যক্তিদের জন্য অধিকতর ভাল।

বিসিএস (আনসার)
আনসার বর্তমানে দেশের অন্যতম বৃহত্তর সসস্ত্র সিভিল বাহিনী। এর রয়েছে বিশাল লোকবল আর কর্মযজ্ঞ। জাতীয় নিরাপত্তার কাজে নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সহযোগীতা করাই আনসার বাহিনীর প্রধানতম কাজ। এ বাহিনীটি সুশৃঙ্খলিত ও সুসজ্জিত। আনসার থেকে র‌্যাব এ প্রেষনে (ডেপুটেশন) কাজ করার সুযোগ রয়েছে পুলিশ, সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য বাহিনীর সাথে। এছাড়াও জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে যাবারও সুযোগ রয়েছে। এ পেশায় মামলা পরিচালনা বা অপরাধ আমলে নেবার মত বিষয় না থাকলেও রয়েছে নিরাপত্তার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গুরুভার দায়িত্ব। যারা শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনাচরণে অভ্যস্ত, কঠিন শারীরিক চাপ নিতে প্রস্তুত আর ইউনিফর্মধারী চাকরি করতে পছন্দ করেন তাদের পছন্দের তালিকায় আনসার আসতে পারে।

বিসিএস (তথ্য)
বিসিএস তথ্য ক্যডারটি তিনটি উপ-ক্যডারে বিভক্ত। এ তিনটি উপ-ক্যডার সম্পর্কে আলাদাভাবে আলোচিত হলো:
সহকারী পরিচালক (অনুষ্ঠান)
যারা শিল্পকলা (সংগীত, অভিনয়, নাটক, চলচ্চিত্র ইত্যাদি) বিষয়ে আগ্রহী এবং এ সম্পর্কিত ভাললাগা রয়েছে তারা এ ক্যাডারটি পছন্দের তালিকায় আনতে পারেন। এ ক্যাডারে বেতার ও টেলিভিশনের অনুষ্ঠান বিভাগে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। সেখানে আপনি বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান (সাংস্কৃতিক, কিংবা টক শো, রিয়ালিটি শো সহ নানা ধরনের) প্রযোজনা করার দায়িত্বে নিয়োজিত হবেন। আর তাই, এ ক্যডার পছন্দের ক্ষেত্রে আপনার এ বিষয়ে আগ্রহই মূল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে প্রয়োজনীয়।

সহকারী পরিচালক/তথ্য অফিসার/ গবেষনা কর্মকর্তা
এ উপ-ক্যডারে আপনি কাজ করার সুযোগ পাবেন তথ্য মন্ত্রণালয়, সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট, জেলা পর্যায়ে তথ্য অফিস সহ সরকারের নানা জায়গায়। এছাড়াও বিদেশী মিশন আর মন্ত্রীদের তথ্য কর্মকর্তা হিসেবেও কাজ করার সুযোগ রয়েছে। তবে এ পেশায় আপনার পূর্বোল্লেখিত উপ-ক্যডারের মত সাংস্কৃতিক বিষয়সমূহের প্রতি আকর্ষণ থাকাটা আবশ্যক নয়। আপনার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে এ ক্যাডারে আসার জন্য থাকতে হবে দাপ্তরিক কাজ করার আগ্রহ আর ধৈর্য্য।

সহকারী বার্তা নিয়ন্ত্রক
দেশ বিদেশের চলমান ঘটনাপ্রবাহ, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক বিষয়ে আগ্রহী হয়ে থাকলে আপনি পছন্দ হিসেবে বেছে নিতে পারেন এ ক্যডার চাকরিটি। এ উপ-ক্যডারে আপনি সরকারী ইলেক্ট্রনিক ও সংবাদ মাধ্যমগুলোতে আপনি পাবেন সংবাদ তৈরী ও প্রকাশে কাজ করার সুযোগ। যারা টক শো, সংবাদ ইত্যাদি দেখতে পছন্দ করেন তাদের জন্য এ চাকুরি হতে পারে পছন্দের বিষয়।

বিসিএস (ইকনমিক)
আর্থ-সামাজিক গবেষণা ও বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী, সরকারের নীতি-নির্ধারণী কাজে যুক্ত থাকতে ইচ্ছুক হলে ইকোনমিক হতে পারে আপনার প্রথম পছন্দ। প্ল্যানিং কমিশন, একনেক, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে প্রথম থেকেই আছে কাজ করার সুযোগ। এজন্য আপনার যে সমস্ত ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যগুলো থাকা জরুরী সেগুলো হলো: দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যপারে আগ্রহ, পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণী বিষয়ে আগ্রহ, অর্থনীতি বিষয়টি নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে আগ্রহ, গাণিতিক ও পরিসংখ্যানিক বিশ্লেষণে আগ্রহ ও পারদর্শিতা, খুটিনাটি ডেস্কওয়ার্ক এ পারদর্শীতা ইত্যাদি।

অন্যান্য ক্যাডার (সাধারণ)
বিসিএস ডাক, পরিবার পরিকল্পনা, রেলওয়ে, সমবায়, খাদ্য সহ আরো যে সমস্ত ক্যডার রয়েছে এগুলোতে তেমন বিশেষ ধরনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা করাটা জরুরী নয়। এ ক্যাডারগুলো অধিকতর দাপ্তরিক। কর্মক্ষেত্রের বিবেচনায় আপনি পছন্দের তালিকায় এ ক্যাডারগুলোর ক্রম ঠিক করতে পারেন।

টেকনিক্যাল ক্যাডার
আপনি যদি হয়ে থাকেন আপনার পঠিত বিষয়ের প্রতি আগ্রহী, আপনার দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে অর্জিত শিক্ষা সরাসরি কাজে লাগাতে চান দেশ ও জাতির সেবায় তাহলে অবশ্যই পছন্দ করতে পারেন আপনার সংশ্লিষ্ট টেকনিক্যাল ক্যাডার। বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারটিতে আসতে হলে আপনার যে সমস্ত চারিত্রিক বৈশিষ্ট থাকা জরুরী: বহির্মুখী ব্যক্তিত্ব, কথাবার্তায় স্মার্ট, অন্যদের বোঝাতে পারার সক্ষমতা আর নিজের বিষয়ের প্রতি আগ্রহ।

নিজ বিষয়ে আগ্রহ না থাকলে শিক্ষা ক্যাডারে না আসাটাই উত্তম। কেননা, আপনি যদি আপনার পঠিত বিষয়ে আগ্রহী নাই হোন, আপনি কী করে শিক্ষার্থীদের মাঝে উক্ত বিষয়টি আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করবেন আর সে বিষয়ে অন্যদের আগ্রহ সৃষ্টি করবেন?

শিক্ষকতা পেশাটিকে চাকরি হিসেবে না নিয়ে এটিকে এক ধরনের কলা (আর্ট) হিসেবে নেওয়াটাই উত্তম। বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারটি শিক্ষার মতই সেবাধর্মী ও মহৎ। এটি সহ অন্যান্য টেকনিক্যাল ক্যাডারের ক্ষেত্রে প্রায় একই কথা প্রযোজ্য।

শেষকথা
যেহেতু কাজ জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আর সরকারি চাকরি জীবনব্যাপী স্থায়ী কাজ, তাই এটি শুরু করার আগে আপনার উচিত সিদ্ধান্ত নেওয়া। এজন্য আপনার ব্যক্তিগত চরিত্রের সাথে মানায় এমন চাকরি পছন্দ করাটাই বাঞ্ছনীয়। আর তা না হলে সারাজীবন হা হুতাশ করে কাটাতে হবে। চাকরিকে মনে হবে অভিশাপ। নিজেকে নিজে আজীবন দোষ দেওয়ার চেয়ে আগেই বিশ্লেষণ করে নিন আপনার ব্যক্তিত্ব, পছন্দ-অপছন্দ আর ভাল-মন্দ লাগার বিষয়গুলো। যদিও এ অধ্যায়টি আপনার ক্যাডার পছন্দের ক্ষেত্রে একটি গাইডলাইন হতে পারে, তথাপি আপনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত একান্তই আপনার। নিজেকে আরো জানুন, বিশ্লেষণ করুন। তারপর নিন আপনার সিদ্ধান্তটি। জীবনটা তবে একটু হলেও হতে পারে অন্যরকম।


প্লাবন ইমদাদ

প্লাবন ইমদাদ

Plaban Imdad

এসিসটেন্ট কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট

বর্তমানে কুমিল্লা জেলা প্রশাসনে কর্মরত

Share on FacebookTweet about this on TwitterShare on Google+Email this to someonePrint this page

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *