হেপাটাইটিস বি’র চিকিৎসায় বাংলাদেশি চিকিৎসক-বিজ্ঞানীর সাফল্য

ডা. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর ও ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)

হেপাটাইটিস বি’র চিকিৎসায় ‘ন্যাসভ্যাক’ নামে নতুন ওষুধের সফল ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করেছেন বাংলাদেশি দুই চিকিৎসা বিজ্ঞানী ডা. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর ও ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)। এরই মধ্যে কিউবাতে প্রয়োগ শুরু হয়েছে তাদের উদ্ভাবিত নতুন এই ওষুধ। যদিও আইনি জটিলতায় বাংলাদেশে এখনো এ ওষুধের ব্যবহার সম্ভব হয়নি।
হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের সংক্রমণে রোগীদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ ক্রনিক হেপাটাইটিস বি বা লিভারের স্থায়ী রোগে আক্রান্ত হন। এই রোগ থেকে পরে লিভার সিরোসিস এবং লিভার ক্যান্সারও হতে পারে। বাংলাদেশে প্রায় ৭০ শতাংশ লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের জন্য দায়ী এই হেপাটাইটিস বি ভাইরাস। প্রতি বছর এই ভাইরাসের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে লিভারের বিভিন্ন রোগে মারা যান ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ। খবর বাংলা ট্রিবিউনের।
জানা গেছে, হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে জাপানের এহিমে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২০ বছর গবেষণা করছেন ডা. আকবর। জাপানের সরকারি এই বিশ্ববিদ্যালয়টি গবেষণার জন্যও সারাবিশ্বে স্বীকৃত। এ ছাড়া একই সময়ে বাংলাদেশে ‘হেপাটাইটিস বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত প্রায় এক হাজার রোগী নিয়ে কাজ করেছেন ডা. মাহতাব। বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় ‘ন্যাসভ্যাক’ সুফল বয়ে আনতে পারে বলে উঠে আসে এসব গবেষণায়। ডা. মামুন আল মাহতাব বলেন, ‘এই ওষুধ হেপাটাইটিস বি ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়িয়ে দেয়।’
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) হেমাটোলজি বিভাগের এই সহযোগী অধ্যাপক বলেন, ‘হেপাটাইটিস বি’র চিকিৎসায় ‘ন্যাসভ্যাক’ কিউবা ও জাপানে প্রাথমিক গবেষণায় অত্যন্ত প্রতিশ্রুতিশীল প্রমাণিত হয়। এরপর আমরা দেশে ‘ক্রনিক হেপাটাইটিস বি’ রোগীদের চিকিৎসায় এই ওষুধটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করার সিদ্ধান্ত নেই এবং সাফল্যও পাই। কিন্তু আমাদের দেশে আইনি জটিলতার কারণে এটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।’ দেশে এই ওষুধের ব্যবহার চালু করা গেলে হেপাটাইটিস বি রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কমে আসত বলে জানান তিনি।
ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে হেপাটাইটিস বি’র নতুন ওষুধ ‘ন্যাসভ্যাক’-এর সাফল্য সম্পর্কে ডা. মাহতাব বলেন, ‘২০০৯ সালে ১৮ জন ক্রনিক হেপাটাইটিস রোগীর ওপর ন্যাসভ্যাকের প্রথম ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করি। ট্রায়ালে ক্রনিক হেপাটাইটিস বি’র চিকিৎসায় ব্যবহƒত অন্য সব ওষুধের তুলনায় এটি বেশি নিরাপদ হিসেবে প্রমাণিত হয়। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা যায়, ন্যাসভ্যাক ব্যবহারে শতকরা ৫০ ভাগ ক্রনিক হেপাটাইটিস বি রোগীর রক্ত থেকে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস সম্পূর্ণ নির্মূল হয়েছে। আর শতভাগ রোগীর লিভারের প্রদাহ পুরোপুরি ভালো হয়েছে।’ ন্যাসভ্যাকের এই সাফল্যের খবর এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় লিভার অ্যাসোসিয়েশনের জার্নাল ‘হেপাটোলজি ইন্টারন্যাশনাল’-এ প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালের নভেম্বর সংখ্যায়।
এরপর ২০১১ সালে ১৫১ জন ক্রনিক রোগীর ওপর ন্যাসভ্যাকের দ্বিতীয় ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানো হয়। এই ট্রায়ালের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ ও এফডিএ এবং বাংলাদেশের ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অনুমতি নেয়া হয়। পাশাপাশি বিএসএমএমইউ ও বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলের ‘ইথিক্যাল অ্যাপ্রুভাল’ও নেয়া হয়। এই ট্রায়ালে ৭৫ জন ক্রনিক হেপাটাইটিস বি রোগীকে ১০ বার দেয়া হয় ন্যাসভ্যাক ওষুধটি। বাকি ৭৬ জনকে ৪৮ বার দেয়া হয় বর্তমান বিশ্বে হেপাটাইটিস বি চিকিৎসায় অন্যতম কার্যকর ও সবচেয়ে দামি ওষুধ ‘পেগাইলেটেড ইন্টারফেরন’। ৬ মাস পর দেখা যায়, পেগাইলেটেড ইন্টারফেরন ব্যবহারে ৩৮ শতাংশ রোগী উপকৃত হয়েছেন। বিপরীতে ন্যাসভ্যাকে আরোগ্য হয়েছেন ৫৯ শতাংশ রোগী। এক বছর পরও ন্যাসভ্যাক ওষুধ গ্রহণকারী রোগীদের কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এই ট্রায়ালেই এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, লিভারের ইনফেকশনের চিকিৎসায় প্রচলিত অন্য ওষুধগুলোর তুলনায় ন্যাসভ্যাক অনেক বেশি কার্যকর।
ন্যাসভ্যাকের তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালটি চালানো হয় ২০১৩ সালে। এই ট্রায়ালটি লিভার বিশেষজ্ঞদের সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক কনফারেন্স হিসেবে স্বীকৃত আমেরিকান লিভার মিটিংয়ে ‘প্রেসিডেন্সিয়াল ডিস্টিংশন পদক’ লাভ করে। এরপরই এটি বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত শুরু হয় কিউবাতে। দেশটিতে ‘হেবার-ন্যাসভ্যাক’ নামে বিক্রি হচ্ছে ওষুধটি। রাশিয়াতে চলছে মাল্টিসেন্টার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল। জাপানেও ওষুধটির ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন মিলেছে। শিগগিরই সেখানে চালানো হবে এর ট্রায়াল।
ওষুধটি বাংলাদেশে কেন ব্যবহার করা যাবে না, জানতে চাইলে ডা. মামুন আল মাহতাব বলেন, ‘বাংলাদেশে কোনো ওষুধের গবেষণা চালিয়ে সাফল্য পাওয়া গেলেও ওই ওষুধের নিবন্ধনের বিষয়ে কোনো আইন নেই। যে কারণে দেশে এখনই ন্যাসভ্যাক ব্যবহার করার সুযোগ নেই। তবে ওষুধের গুণগত মান বিচারে নিবন্ধনের বিধি যুক্ত হতে পারে।’
এদিকে ওষুধ প্রশাসনের একটি সূত্র জানিয়েছে, অতি সম্প্রতি ন্যাসভ্যাক নিয়ে গবেষকদের সঙ্গে কথা বলেছে ওষুধ প্রশাসন। আগামী মে মাসে ওষুধ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে একটি বৈঠক করার কথা রয়েছে। বৈঠকে ন্যাসভ্যাক গবেষকদের সাফল্য তুলে ধরা হবে। সবকিছু অনুকূলে থাকলে ওষুধ প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেবে বলেও জানিয়েছে ওই সূত্র।


খবর : bdsuccess.org

Like
Like Love Haha Wow Sad Angry
Share on FacebookTweet about this on TwitterShare on Google+Email this to someonePrint this page

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *