বড় বাবু সমাচার: সরকারি চাকরিতে আমার ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা ।। নাজনীন মায়া

২০১১ সালে বেশ অপরিণত বয়সে সরকারি চাকরিতে যোগদান করি। তখন আমার বয়স ২১ বছর ১০ মাস। যোগদান করতে এসে প্রথম যে মানুষটার হাতে কাগজ পত্র দিতে হয় তাকে বড়বাবু বলে। কী আদরের নাম–‘বড়বাবু’।
প্রত্যেক সরকারি অফিসে বড়বাবু নামের মানুষটা আছে। আমি বেশ অস্থির, সাথে ভাগ্যটাও। চাকরিটার জন্য আমাকে ছুটতে হয়েছে ভীষণ অস্থিরতার সাথে, সাড়ে ৬ বছরে ৫ জায়গায় গেছি । তাই আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা একটু বেশি, বিশেষ করে আমাদের প্রিয় বড়বাবুদের সাথে।
যোগদানের প্রথম দিন ঘুষ ছিল মাত্র ১০০ টাকা। পরে অবশ্য বেতন বাড়ার সাথে সাথে ঘুষও বেড়েছে। ছুটি নিতে গেলেও দিতে হতো কিছু না কিছু। কিছুদিন পর ওখান থেকে ছাড়পত্র নিয়ে অন্য অফিসে যোগদান করি।
উপজেলা সদর হাসপাতালে আমার নিয়োগ ছিল, কিন্তু ছাড়পত্র অত সহজে পাওয়া যাবে না। আবার টাকার বিনিময়ে সব করতে হলো। মনে পড়ে, ছাড়পত্র নেবার জন্য আমাকে সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন অফিসে যেতে হয়েছিল, যিনি ওখানে বড় বাবু, তিনি আমার চোখে পানি এনে দিয়েছিলেন, আমি অবাক হয়েছিলাম!
৫০০০ টাকা চাইল, আমি হতবাক হয়ে গেলাম। কারণ, তখনো এইসব অভিজ্ঞতা আর্জিত হয়নি। তিনি সরাসরি বললেন বড় অফিসে কত খরচ করে আসছ আর আমরা আঙুল চুষব?
সত্যিই তাই, কেননা নিজ প্রয়োজনে খুলনা অফিসে অনেকগুলো টাকার বিনিময়ে বদলী আদেশটা করিয়েছিলাম। আর ওনাকে কিছু না দিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রীর এলাকা থেকে কেমনে বের হই। এ কথাটা উনিই আমাকে বললেন।
অনেক ভয় দেখালেন। বদলীটা আমার জন্য প্রাণের দাবী ছিল তখন। কাছে ১০০০ টাকা ছিল, উনি বললেন, আজ এটা দিয়ে যাও বাকিটা কাল দিয়ে কাগজপত্র নিয়ে যেও।
তাই করলাম। একা ছিলাম, বোকা ছিলাম। পরে জানলাম, ওটার কোনো দরকার ই ছিল না। যাইহোক রিলিজ নিয়ে আবার নতুন অফিস, যোগদান করলাম এবার যোগদানে টাকা লাগল না, বড় বাবু না বলে ওনাকে বড় ভাই বলতাম। মানুষটা ভালো ছিল, কিন্ত টাকা যাবেই, প্রথম বেতন করার জন্য ৫০০টাকা উনি চেয়ে নিলেন পরে। 
টাকা দিতে আপত্তি ছিল না, ওনাকে অনেক বিশ্বাস করতাম, আর কোনোদিন উনি আমার কাছে থেকে কিছু চাননি। উনি থাকা পর্যন্ত বেশ ভালো ছিলাম। তারপর বড়ভাই পরিবর্তন হয়ে আসল আরেক বড়বাবু।
উনি আমার দেখা সবচেয়ে বিরক্তিকর বড়বাবু। যেকোনো কাজে উনি টাকা ছাড়া শুধু আমাকে না কোনো অফিসকর্মীকেই চিনতে পারতেন না। একটা যেকোনো কাজের জন্য সকাল ১০টা থেকে বেলা ৪টা বাজিয়ে দিতেন।
ঘুষ খাওয়ার জন্য

কারণটা স্পষ্ট—যাতে করে নগদ অর্থের পরিমাণটা বাড়ে। ওনাকে একটা কাজের জন্য ১০০০০টাকার একটা খাম দিয়েছিলাম, টাকাগুলো গুণে দেয়া হইছিল না। কাজটা হলো না, কিন্তু টাকাটা ফেরত নেবার সময় উনি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, আরে তুমি তো আমাকে ৮০০০ টাকা দিয়েছিলে!

আমি যে কতটা বোকা সেটার প্রমাণ হলো আবার। আমি যে পুরো টাকাটাই দিয়েছি তা ওখানে ওনাকে বলে বিশ্বাস করানো সম্ভব ছিল না, তাই চেষ্টা নিরর্থক হতো।
আমি খামটা নিলাম, শুধু স্রষ্টাকে বললাম, পৃথিবীতে এ কোন ধরনের প্রাণী তুমি পাঠিয়েছ? এটা একটা প্রেষণ আদেশের কাজ ছিল। পরবর্তীতে আমাদের স্যার এম্নিতেই করে দিয়েছিলেন, কিন্ত প্রথমে রাজি ছিলেন না, তাই খাম ভর্তি করতে হয়েছিল। তবুও সব কাগজপত্র প্রস্তুত করতে বড়বাবু আবার কিছু নিলেন।
জেলার সিভিল সার্জনের বড় বাবুও কিছু নিলেন। তখনও ঐ অফিসটা আমার মূল কর্মস্থল ছিল আর আমি ঔ বড়বাবুর হাতেই ছিলাম, তবুও সাময়িক মুক্তি পেলাম। আমি আমার নিজ বাড়ির পাশে একটা ইউনিয়ন সাবসেন্টারে যোগদান করলাম। যেহেতু বড়বাবুদের সম্পর্কে বেশ অভিজ্ঞতা লাভ করে এসেছি তাই যোগদান করার পর ঐ একইভাবে কাজ করতে গেলাম, কিন্ত উনি আমার ধারণাটা পাল্টে দিলেন।
এতদিন বড় বাবু, না হয় বড় ভাই পেয়ে এসেছি। এবার পেলাম আংকেল, ওনাকে আমার বড় বাবু বলতে বা ভাবতে ভালো লাগেনি। উনি আমাকে আম্মু বলে ডাকতেন। আমাদের মেহেরপুর সদর উপজেলার প্রধান সহকারী, মোশাররফ আংকেল। ঔ অফিসটাকে ভীষন ভাল লাগত। ওই অফিসে আমার পোস্টের একজন পিআরএল এ যাবেন (অবসরে) কিছুদিন পর, তাই ঔ পোস্টের জন্য আমি বিভাগীয়ভাবে আবেদন করলাম।
অনেকগুলো টাকার বিনিময়ে কাজটা করতে হল। আমার কাজটা হয়ে গেছিল, আমি খুব খুশি হয়েছিলাম। ছাড়পত্র নেয়া হল, আবার সেই পূর্বের মত—বড় বাবুদের খুশি করে করে।
আমি ভালো মুডে ছিলাম তখন, তেমন কিছু মনে হলো না, কিন্ত অতি আনন্দ বেদনায় রূপ নিল দ্রুতই। জানি না কোন পাপের শাস্তিতে আমার এক শ্রদ্ধেয় বড় ভাই আমার আদেশ বাতিল করে মন্ত্রণালয় থেকে ওই পোস্টে ওনার আদেশ করে আনলেন। ওই ভাইটার উপর তেমন অভিমান হলো না। আসলে অনেক জায়গাতে চাকরি করে দেখেছি—যারা আমাদের মত ডিপ্লোমা লাইনে পড়েছে কয়েকজন বাদে সবার মনই কেমন যেন। কোনো ভাষা পাচ্ছি না বিশেষণ দেবার মতো।

খুব হতাশ হলাম, হতাশায় আমার বুকের বাম পাশটাতে ব্যথা শুরু হলো, যা আজও কমেনি। সেই সময় কারো কাছ থেকে সামান্যতম সাহায্যও পাইনি। আমি বেশ কিছুদিন ঝুলে থাকলাম। খুলনা অফিস আমাকে মাগুরা সদর উপজেলাতে নিয়োগ দিল। আর আদেশে লেখা ছিল আমি যেন আমার জেলার সদর হাসপাতালে কাজ করতে পারি।



এখানেও সব প্রিয় বড়বাবু আর পরের ঘটনাগুলো একই। যাইহোক, আমি তবুও খুশি ছিলাম। ভাবলাম, আল্লাহ যা করেন ভালর জন্যই তো করেন। শহরে বাসা নিয়ে আমার চার বছরের ছেলে বাচ্চা আর শ্বশুড়িকে নিয়ে সুন্দর একটা সংসার বানালাম। গ্রামের বাড়ি শহর থেকে দূরে ছিল না। তবুও বাবুকে ভালো স্কুলে পড়ানোর জন্য বাড়ি থেকে অনেকটা সংগ্রাম করে চলে আসলাম।

আব্বা মা কোনোদিনও চায়নি আমি একা থাকি, কোনোদিনও একা সিদ্ধান্ত নেবার সুযোগ পরিবার থেকে পাইনি। কোনো একান্ত কথা বলার সাহস সেই জন্মের পরই রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে যে ভুলগুলো হয়েছে বা করেছি তার জন্য সবাইকে ভুগতে হয়েছে। শহরে এসে ২০০৫ সালের কলেজের এক বন্ধুর সাথে পরিচয় হলো।
ও কিছুদিন পর আমার বাসাতে প্রায়ই আসা শুরু করল। আমি ছেলেদের থেকে অনেক দূরত্ব নিয়ে চলতাম। ও ভালো ছেলে ছিল। কোনোদিনও ভাবিনি বা ও ভাবেনি যে আমাদের মধ্যে বিশেষ কিছু হতে পারে। একটা ছেলে আর একটা মেয়ের মধ্যে স্বাভাবিক কোনো সম্পর্ক থাকে না—সেটা সবাই জানে। আল্লাহর শপথ দিয়ে আমরা বন্ধুত্বের সম্পর্ক শুরু করলাম।
আমার হাজবেন্ড দূরে চাকরি করতেন, সাথে তাঁর সাথে মনের দূরত্ব আরো বেশী ছিল। আমরা বন্ধুত্বের শপথ ভুলে গেলাম। এখানে নিজেকে ধোয়া তুলসী পাতা বলেছি না। আমি হাসপাতালের পাশেই একটা ডায়াগনস্টিক ল্যাবের পিছনের বাসায় থাকতাম।
সত্যি বলছি, কোনো ওষুধ কোম্পানি আর ডায়াগনস্টিক ল্যাবের কাছে আমি বিক্রি হইনি, তবু আমার বাসার ঔ ল্যাবটাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছি। কিন্ত কী অবাক করা কাণ্ড ওই ল্যাবের দুজন ভাই আমার বর্ণাঢ্য কাহিনী চিত্রায়িত করল। পুরো জেলাবাসীর, আমাদের এলাকাবাসীর আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ালাম আমি!
কয়দিন গৃহবন্দী হয়ে সবার কথা হজম করলাম। এভাবে আর কদিন যায়? হাসপাতালে গেলাম, সবাই আমাকে চিড়িয়াখানার নতুন জন্তু ভেবে দেখতে আসে, গ্রামের মানুষজনও। অফিসে কতজন এসে যে রসালো ব্যাঙ্গাত্বক কথা বলে যাচ্ছিল! বেশি করে কথা সহ্য করার শক্তি বাড়াচ্ছিলাম। আমার সহ কর্মীরা আমাকে যেন চিনতেই পারল না, কথা তো বহু দূরের কথা।

এর মধ্যেই আমার জেলার পাশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আমার নিয়োগ আদেশ করানো হয়েছিল। ঔ মুখরোচক ঘটনাটা জীবনটাকে পরিবর্তন করে দিল। অনেকেই সুযোগ নিতে চাইল, বেশি চাইল অফিশের বড় বাবু, যার আমার বয়সি মেয়ে আছে। বড় বাবু তখন টাকাতো চাইলই সাথে অন্য কিছুও চাইলেন, না হলে চাকরির নতুন নিয়োগ আদেশ বন্ধ করে দেবেন বলে জানালেন।

জানতাম যে উনি কিছুই করতে পারবেন না, তবুও টাকা দিলাম যা চাইলেন। যাতে কিছুদিন ছুটি পাওয়া যায়, কিন্ত পারলাম না আমাকে দিতে। মেয়ে হয়ে জন্ম নেবার প্রথম দুঃখটা প্রাণ ভরে পেলাম। মাগুরা সদর উপজেলা যেখানে আমার মূল কর্মস্থল ছিল সেখান থেকে সব কাগজপত্র প্রস্তুত করে আনলাম। হাজার সালাম মাগুড়া সদর উপজেলার বড় ভাইকে যিনি কোনো কাজে আমার কাছ থেকে কিচ্ছু চাননি কোনদিনও ।
এবার আমার হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নেবার কথা, আমার আর ঔ অফিসে কাজ করার মতো কোনো অবস্থা ছিল না। চোখ কান বন্ধ করে সেদিনটা কাটালাম। বড়বাবু দশ মিনিটের কাজ চারদিনের দিন করে দিলেন। ভাবছেন, এমনি এমনি? এটা ভাববেন না। আবার নতুন অফিসে যোগদান, আবার বড়বাবু আর বাকিটা তো জানা।
এই বড়বাবুটা বেশ রোমান্টিক বটে। বাবার চেয়ে বয়সে বড় একজন মানুষের নাকি আমাকে দেখলে মনে বসন্তের হাওয়া বয়ে যাই। আরো কত কী যে…..। তবুও কাজের জন্য ওনার রুমে যেতে হতো। আমি পিছন ফিরে বসেছিলাম, চমকে উঠলাম আমার পিঠে বড়বাবুর হাতের স্পর্শে। খুব রিএক্ট করলাম আর বেশ শক্ত কিছু কথা বললাম।
পরের দিন আমাকে ডেকে বললেন, খুলনা থেকে কি কোনো ফোন এসেছে? বুঝলাম আমাকে এখান থেকে সরতে হবে। একমাসও হলো না এক লাখ টাকা দিয়ে নিজ এলাকাতে আসা। বিচলিত হলাম না। শুধু ধন্যবাদ দিয়ে বললাম, আদেশ আসলে জানাবেন।
অপেক্ষা করছিলাম নতুন কোনো বড়বাবুর সাথে সাক্ষাতের। অপেক্ষার অবসান হলো। তবে আমাকে বড়বাবু দয়া দেখালেন, পরে বললেন, এ যাত্রায় তোমাকে বাঁচিয়ে দিলাম। কিন্ত বাড়ির পরিবেশ আর মানসিক অবস্থা করুণ হয়ে যাচ্ছিল, তাই হুট করে একজনের সাথে মিউচুয়াল ট্রান্সফার করে নিলাম কাউকে না জানিয়ে।

আমার নিজ ইচ্ছাতেই নতুন জায়গায় যোগদান করলাম। আচার অনুষ্ঠান একই। যোগদান, বড়বাবু আবার সেই একই কাহিনী। এখানে একমাস হয়ে গেল, আবার নতুন করে বেতনের জন্য নগদ প্রদান বাধ্যতামূলক। তবে হাওয়া বদলে ভাল আছি। আর প্রিয় মেহেরপুরকে ব্লক লিস্টে দিয়ে দিয়েছি। আমার সমগ্র সরকারি বেতনের সিংহভাগ ভোগ করেছেন কারা তা বোঝা গিয়েছে নিশ্চয়ই এতক্ষণে।

জীবনের মত চাকরিটাও খুব ভোগান্তি দিয়েছে। আমার সোনার বাংলার মানুষগুলো সোনার মানুষ হয়ে উঠুক একদিন। যারা টেবিলের বড় চেয়ারের ওপাশে বসে থাকে তারা যেন সামনের ছোট চেয়ারে বসে থাকা নিরুপায় মানুষগুলোকে খুব বেশি না হোক অল্প একটু বোঝার চেষ্টা করেন। আমার লজ্জা লাগে বলতে এখন যে আমি সরকারি চাকরি করি।
তবু সবাই কত টাকা ঘুষ দিয়ে সরকারি চাকরির পিছে দৌঁড়াচ্ছে! আর আমার চাকরি আমাকে হাঁপিয়ে দিয়েছে। আর পেরে উঠছি না, তবু ছাড়তে পারি না কারণ, কেউ না দেখলে তখন তো এই চাকরিটা আমাকে দেখবে।

নাজনীন মায়া

মেডিকেল এসিসট্যান্ট নাজনিন নাহার

You may also like...