রেলওয়ে চাকরিতে বিড়ম্বনা, সম্ভাবনা ও হতাশা ( পর্ব- তিন) – হাসিনা খাতুন

হাসিনা খাতুন

আশৈশবের ভাগ্যাহত আর হতাশাবাদী মানুষ আমি সম্মুখে যেদিকে চাই কেবলই হতাশার ধূসর মাঠ চোখে পড়ে ৷ বিড়ম্বনাতো নিত্যসঙ্গী ৷ কর্মক্ষেত্র সংশ্লিষ্ট যে বিড়ম্বনাসমূহ প্রতি পদক্ষেপে আমার নিত্যসঙ্গী তা নিম্নে তুলে ধরছি—
১. চাকরির তদবিরঃ প্রতিদিন অসংখ্য আত্নীয় ও পরিচিত জন বিভিন্ন পদে চাকরির তদবিরের জন্য ফোন দেন ৷ বিষয়টি আমার জন্য খুবই বিব্রতকর ৷ প্রতিদিন অন্তত পাঁচজনকে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরি প্রাপ্তির পদ্ধতি বর্ণনা করতে হয় ৷ আমি অতিশয় বিনয়ের সাথে বোঝাতে চেষ্টা করি, কিন্তু ফলাফল শুন্য ৷

২. টিকেটের তদবিরঃ তিনদিনের ছুটি শুরুর আগের দিন ফোন দিচ্ছে আপু আমি ঢাকা থেকে চিটাগাং যাবো একটা সিঙ্গেল বার্থ বা এসি চেয়ারের টিকেট রাখতে পারবেন? আমি ট্রেনে ওঠার সময় নিয়ে উঠবো ৷ যারা রেলওয়ের টিকেটিং সিস্টেম সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা রাখেন তারা বেশ ভালভাবেই জানেন এটা অনেকটা মামার বাড়ির আবদার কেননা—

ক) আমার পোষ্টিং রাজশাহী ৷ আমি বড়জোর পশ্চিমাঞ্চলের দুই একটা টিকেট সংগ্রহ করে দিতে পারি, পুরো দেশের নয় ৷

খ) ট্রেনের টিকেট এখন যাত্রার তারিখের দশদিন আগে থেকে কাউন্টারে পাওয়া যায় ৷ বেশীরভাগ টিকেটই সকলের জন্য কাউন্টারে ওপেন থাকে ৷ বিক্রি শেষ হলে আমার নিজের জন্য হলেও পাবো না ৷

গ) বুকিং সহকারীরা চাকরি করতে এসেছে, ব্যবসা নয় যে আমি বললাম, আমার জন্য দুটো টিকেট রাখ অমনি পকেটের টাকা দিয়ে কেটে রেখে দেবে, আর আপনি ইচ্ছে করলেই ট্রেন ছাড়ার এক বা দুই ঘন্টা আগে জানাবেন আপনার টিকেট টা আর লাগবে না ৷

৩. অনেকে বেশ ফলাও করে প্রচার করেন ওমুক স্টেশনে এই সমস্যা দেখার কেউ নাই ৷ আমি তাদেরকে বিনয়ের সাথে উদাহরণস্বরূপ জানাতে চাই, পাকশী ডিভিশনে দুজন সহকারী ও একজন বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা রয়েছেন৷ যাদের জুরিসডিকশন রহনপুর টু জয়দেবপুর আর খুলনা টু চিলাহাটি ৷ তাদের বাহন বলতে চলাচলরত ট্রেন ৷ মাসে কয়বার প্রতিটি স্টেশনে পদার্পণ সম্ভব তা বুদ্ধি ও বিবেক দ্বারা সহজেই অনুমেয়৷
৪. সরকারি যে কোন প্রতিষ্ঠানের তুলনায় রেলওয়েতে বেয়াড়া কর্মী বেশী ৷তাদের নিয়ন্ত্রণ করাও বেশ কঠিন ৷ কারন অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমি যা পেয়েছি তা আরো হতাশাজনক ৷ রেলওয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরিগুলোতে রয়েছে বড় অঙ্কের পোষ্য কোটা৷ অধিকাংশ কর্মচারী তার বিপথগামী বা অযোগ্য সন্তানটিকে মরিয়া হয়ে রেলওয়ের চাকরিতে পাঠাচ্ছে ৷ তারাও রেলটাকে বাপ দাদার সম্পত্তি ভাবছে৷ ফলে আমরা পাচ্ছি দলে দলে অদক্ষ, অকর্মন্য আর বিপথগামী কর্মী ৷ বিগত কয়েক মাসে চাকরি হতে অপসারণযোগ্য যে কয়জন অপরাধী পেয়েছি খোঁজ নিয়ে জেনেছি তারা সবাই জন্মদাতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে৷

৫. সৃষ্টির আদিলগ্নে মানুষ প্রতিকুল পরিবেশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে বাঁচার তাগিদে সংঘবদ্ধ হতো ৷ এখন দৃশ্যপট বদলেছে ৷ এখন লুটেরারা সংঘবদ্ধ হয়ে তাণ্ডব চালায় ৷ আর কথিত ভাল মানুষগুলো আত্নরক্ষার্থে নানা রকম ছত্রছায়ায় আশ্রয় নেয় ৷পুরো দেশটার মত আমার এ পোড়া রেলটাতেও সংঘবদ্ধ লুটেরাদের জয়জয়কার ৷

এরপরও হয়তো অনেকে উন্নয়নের জোয়ারের দোহাই দিয়ে আমাকে আশাবাদী করতে চাইবেন, কিন্তু পুরোদস্তুর বাণিজ্যিক বিভাগের একজন কর্মী হয়ে আমি আমার নিজের জন্য আশার আলো দেখি না ৷ আমি বিশ্বাস করি, পৃথিবীর যে সকল দেশে উন্নত রেলসেবা বিদ্যমান তার কোন দেশই প্রযুক্তি নির্ভর বিনা টিকেটে যাত্রী প্রতিরোধ সিস্টেম ব্যতীত কেবলমাত্র বাণিজ্যিক বিভাগের কতিপয় কলুর বলদের ঘাড়ে এর দায়ভার চাপিয়ে আত্নতৃপ্তি লাভ করে না৷

বিগত ১৪/১০/১৪ তারিখ হতে রাজশাহীতে কর্মরত অবস্থায় আমার কর্ম পরিবেশ সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন বলতে আমি পেয়েছি মাথার উপরের ফুটো টিন পরিবর্তন ৷ যদিও এখন পর্যন্ত ভাঙ্গা হার্ডবোর্ডের টুকরা মাথায় পড়ার ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকি অধিকাংশ সময় ৷

আমার পরের ব্যাচের কোনো কোনো রেলওয়ে অফিসার এসি রুমে বসেন আবার কেউ কেউ দামি গাড়ি সহ সগৌরবে ফেসবুকে পোস্ট দেন ৷ আর আমি সিলিংবিহীন টিনের চালার নিচে বসে আয়াতুল কুরসি পড়ে গ্রীষ্মের গরমের হাত থেকে রক্ষা পেতে চাই ৷

একপরও যারা আমাকে কেবলমাত্র বেতনভূক্ত কর্মী হিসেবে সন্তুষ্ট মনে উচুমানের সেবা আশা করবেন, তাদেরকে আমি শওকত ওসমানের নিম্নোক্ত বিখ্যাত উক্তিটি মনে করিয়ে দিতে চাই-

দিরহাম দৌলত দিয়ে ক্রীতদাস গোলাম কেনা চলে ৷ বান্দী কেনা সম্ভব ৷ কিন্তু— কিন্তু— ক্রীতদাসের হাসি— না— না—না—না—
হাসি মানুষের আত্নারই প্রতিধ্বনি!


হাসিনা খাতুন

Assistant Chief Commercial Manager( Claims)/ West, from 31st bcs at Bangladesh Railway (BR)

Share on FacebookTweet about this on TwitterShare on Google+Email this to someonePrint this page

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *